বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

শ্রেণিকক্ষের চক-ডাস্টার নাকি ইউনিয়ন পরিষদ: কোথায় যাবেন এমপিও শিক্ষক?


সাইফুর রহমান শামীম
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৪০ এএম

শ্রেণিকক্ষের চক-ডাস্টার নাকি ইউনিয়ন পরিষদ: কোথায় যাবেন এমপিও শিক্ষক?

একটি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক গতিশীলতা ও শিক্ষার মান নিশ্চিত করার পেছনে দুই ধরনের কাঠামোর ভূমিকা অনস্বীকার্য—একদিকে তৃণমূলের উন্নয়ন ও স্থানীয় সেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য ‘স্থানীয় সরকার’, অন্যদিকে জাতির ভবিষ্যৎ গঠন ও মানবসম্পদ তৈরির জন্য ‘শিক্ষা ব্যবস্থা’। কিন্তু সম্প্রতি এই দুই ব্যবস্থার সংযোগস্থলে তৈরি হয়েছে এক গভীর নীতিগত বিভ্রান্তি ও সাংঘর্ষিক বিতর্ক। এমপিওভুক্ত (Monthly Pay Order) বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন কি না—এ নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের ভিন্নমুখী বক্তব্য এবং রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রখর প্রতিক্রিয়া দেশজুড়ে এক বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
​কয়েক দিন আগে আইনমন্ত্রীর এক বক্তব্যে শিক্ষকদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পক্ষে ইতিবাচক ইঙ্গিত মিললেও, শিক্ষামন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়িছিলেন যে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন না। তবে ইদানিং শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে না।আবার স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর কণ্ঠে শোনা গেছে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের স্থানীয় নির্বাচন করতে বাধা নেই‌। এরই মাঝে বিরোধী রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে শিক্ষকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাধা দিলে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। সরকারের ভেতরে নীতিগত ঐক্যের এই অভাব কেবল প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে না, বরং তৃণমূলের শিক্ষা ও স্থানীয় শাসনের সামগ্রিক শৃঙ্খলাকেও হুমকির মুখে ফেলছে।
​প্রশ্ন হলো, একজন শিক্ষক যদি একই সঙ্গে স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি (যেমন: ইউপি চেয়ারম্যান, সদস্য, পৌরসভার মেয়র বা কাউন্সিলর) হন, তবে তিনি কোন আইনি কাঠামো ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতা মানবেন?
​আইনি ও বিধিমালার দিকটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন নীতিমালার অধীন পরিচালিত দুটি আলাদা জগত। এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা ‘বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা’ এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশাবলী দ্বারা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। এই বিধিমালা অনুযায়ী, একজন শিক্ষককে প্রতিদিন সকাল ৯টা বা সাড়ে ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সার্বক্ষণিকভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে হয়। প্রাত্যহিক সমাবেশ পরিচালনা, ডিজিটাল বা বায়োমেট্রিক হাজিরা প্রদান, নির্ধারিত পাঠ পরিকল্পনা অনুযায়ী দিনে ৩ থেকে ৫টি ক্লাস নেওয়া, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, উত্তরপত্র মূল্যায়ন, এবং টিফিন ও ছুটির সময়ে শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা বজায় রাখা তাদের অর্পিত মূল দায়িত্ব।
​এর বিপরীতে, স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত একজন জনপ্রতিনিধি—তিনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা সদস্য হোন কিংবা পৌরসভার মেয়র বা কাউন্সিলর হোন—তাকেও সার্বক্ষণিক জনসেবায় নিয়োজিত থাকতে হয়। নাগরিকত্ব সনদ প্রদান, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, ভিজিডি-ভিজিএফ বা বয়স্ক ভাতার তালিকা তৈরি, স্থানীয় শালিস-বিচার, ড্রেনেজ ও রাস্তাঘাট সংস্কার তদারকি এবং জরুরি দুর্যোগে ত্রাণ বিতরণের মতো কাজে তাকে প্রতিনিয়ত ইউনিয়ন পরিষদ বা নগর ভবনে উপস্থিত থাকতে হয়।
​সম্প্রতি কুড়িগ্রাম জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি ও প্রবীণ শিক্ষাবিদ অধ্যাপক লিয়াকত আলী এ প্রসঙ্গে অত্যন্ত যৌক্তিক এক প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, প্রতিটি মন্ত্রণালয় নিজস্ব সংবিধিবদ্ধ বিধিতে চলে। এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অনুশাসনে চলেন না; তারা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাধ্যবাধকতায় থাকেন। একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে প্রতিনিয়ত পরিষদের কার্যালয়ে বসতে হয় ও স্থানীয় জনগণের তদারকি করতে হয়। যদি একজন এমপিওভুক্ত শিক্ষক জনপ্রতিনিধি হন, তবে তিনি কীভাবে বিদ্যালয়ের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা বজায় রাখবেন? আর যদি কর্মঘণ্টা না মানেন, তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিধিমোতাবেক তাঁর এমপিও বাতিল এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে। অর্থাৎ, শিক্ষকতা পেশায় থেকে জনপ্রতিনিধি হওয়ার চেষ্টা নীতিগতভাবেই একটি স্ববিরোধিতা। এখন দেখার বিষয় শ্রেণিকক্ষের চক-ডাস্টার নাকি ইউনিয়ন পরিষদ: কোথায় যাবেন এমপিও শিক্ষক?

​এখানে একটি আর্থিক বিষয়ও লক্ষ্যণীয়। সম্প্রতি নতুন জাতীয় বেতন কাঠামোর যে বিশ্লেষণ সামনে এসেছে, তাতে দেখা যায় এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন ও সামাজিক মর্যাদায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি নিশ্চিত করা হচ্ছে। সহকারী শিক্ষক থেকে শুরু করে উচ্চমাধ্যমিক ও ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষদের মূল বেতন আগের তুলনায় দ্বিগুণ বা প্রায় শতভাগ বৃদ্ধির প্রস্তাব রয়েছে। যেখানে রাষ্ট্র শিক্ষক সমাজকে পূর্ণাঙ্গ সামাজিক মর্যাদা ও উপযুক্ত আর্থিক নিরাপত্তা দেওয়ার পথে হাঁটছে, সেখানে একজন শিক্ষকের একই সময়ে অপর একটি নির্বাহী বা রাজনৈতিক পদে আসীন হওয়ার চেষ্টা কতটুকু যৌক্তিক?
​একই মানবদেহে দুটি ভিন্ন দায়িত্বের বোঝা চাপিয়ে দিলে কোনোটিই সুচারুভাবে সম্পাদিত হতে পারে না। যদি একজন শিক্ষক জনপ্রতিনিধি হিসেবে দিনের সিংহভাগ সময় রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক কাজে ব্যয় করেন, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ শিক্ষার্থীরা, ব্যাহত হবে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান। আবার যদি তিনি স্কুলে সময় দেন, তবে স্থানীয় সরকারের সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ তাদের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা ও সেবা থেকে বঞ্চিত হবে।
​আইনের কোনো অস্পষ্টতা বা ব্যাখ্যার মারপ্যাঁচে ফেলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে রাজনীতির আখড়ায় পরিণত করার সুযোগ রাখা কোনো সুস্থ শিক্ষা ব্যবস্থার লক্ষণ হতে পারে না। রাজনৈতিক ফায়দা বা তাৎক্ষণিক সমাধানের কথা না ভেবে, সরকারের উচিত অবিলম্বে একটি সুস্পষ্ট, দ্ব্যর্থহীন ও জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন করা। যদি এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা স্থানীয় সরকার বা অন্য যেকোনো নির্বাচনে অংশ নিতে চান, তবে তাদের প্রথমাংশে শিক্ষকতা পদ থেকে পদত্যাগ বা নিয়ম অনুযায়ী লিয়েন/ছুটি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত।
​শ্রেণিকক্ষের চক-ডাস্টার এবং ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভার নির্বাহী চেয়ার—দুটিই অত্যন্ত দায়িত্বপূর্ণ স্থান। এই দুই ব্যবস্থার মধ্যে দেয়াল তুলে দেওয়াই শিক্ষা ও স্থানীয় শাসন—উভয়ের স্বকীয়তা ও শৃঙ্খলা রক্ষার একমাত্র পথ।

এই সংবাদটি আপনার কেমন লেগেছে?


খবরটি রেটিং দিন

গড় রেটিং: ০/৫ (০ ভোট)

ধন্যবাদ! আপনার মতামত নেওয়া হয়েছে।

অক্সফোর্ড থেকে কোনো সংশোধন ছাড়াই পিএইচডি অর্জন করলেন সানজানা চৌধুরী

অক্সফোর্ড থেকে কোনো সংশোধন ছাড়াই পিএইচডি অর্জন করলেন সানজানা চৌধুরী

বিএনপি নেতাকর্মীদের ‘খাই খাই’ মানসিকতা বন্ধের আহ্বান এমপি রফিকুল ইসলাম জামালের

বিএনপি নেতাকর্মীদের ‘খাই খাই’ মানসিকতা বন্ধের আহ্বান এমপি রফিকুল ইসলাম জামালের

বিএনপি নেতাকর্মীদের ‘খাই খাই’ মানসিকতা বন্ধের আহ্বান এমপি রফিকুল ইসলাম জামালের

বিএনপি নেতাকর্মীদের ‘খাই খাই’ মানসিকতা বন্ধের আহ্বান এমপি রফিকুল ইসলাম জামালের

বিএনপি নেতাকর্মীদের ‘খাই খাই’ মানসিকতা বন্ধের আহ্বান এমপি রফিকুল ইসলাম জামালের

বিএনপি নেতাকর্মীদের ‘খাই খাই’ মানসিকতা বন্ধের আহ্বান এমপি রফিকুল ইসলাম জামালের

দেবীদ্বারে মুরগীর ফার্মে যুবদল নেতাসহ ৩ যুবককে মাদক সেবনরত অবস্থায় আটক

দেবীদ্বারে মুরগীর ফার্মে যুবদল নেতাসহ ৩ যুবককে মাদক সেবনরত অবস্থায় আটক

বিএনপি নেতাকর্মীদের ‘খাই খাই’ মানসিকতা বন্ধের আহ্বান এমপি রফিকুল ইসলাম জামালের

বিএনপি নেতাকর্মীদের ‘খাই খাই’ মানসিকতা বন্ধের আহ্বান এমপি রফিকুল ইসলাম জামালের

প্রত্যন্ত অঞ্চলের বঞ্চিতদের মূলধারায় আনতে চান প্রধানমন্ত্রী: পর্যটনমন্ত্রী

প্রত্যন্ত অঞ্চলের বঞ্চিতদের মূলধারায় আনতে চান প্রধানমন্ত্রী: পর্যটনমন্ত্রী

বিএনপি নেতাকর্মীদের ‘খাই খাই’ মানসিকতা বন্ধের আহ্বান এমপি রফিকুল ইসলাম জামালের

বিএনপি নেতাকর্মীদের ‘খাই খাই’ মানসিকতা বন্ধের আহ্বান এমপি রফিকুল ইসলাম জামালের

ডিসেম্বরে শক্তিশালী ‘এল নিনো’র আশঙ্কা: বিশ্বজুড়ে চরম আবহাওয়ার সতর্কবার্তা

ডিসেম্বরে শক্তিশালী ‘এল নিনো’র আশঙ্কা: বিশ্বজুড়ে চরম আবহাওয়ার সতর্কবার্তা

আরাফাত রহমান কোকো স্মৃতি ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলা শিরোপা চ্যাম্পিয়ন খন্ডকাটা একাদশ

আরাফাত রহমান কোকো স্মৃতি ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলা শিরোপা চ্যাম্পিয়ন খন্ডকাটা একাদশ

পটুয়াখালীতে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ইলিশ শিকারের মহোৎসব

পটুয়াখালীতে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ইলিশ শিকারের মহোৎসব

সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: পৃথক অভিযোগে কারাবন্দি ছিলেন নজরুল-সুইটি

সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: পৃথক অভিযোগে কারাবন্দি ছিলেন নজরুল-সুইটি

ময়মনসিংহে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দুর্গাপূজা উদ্‌যাপিত হচ্ছে রেঞ্জে: ডিআইজি

ময়মনসিংহে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দুর্গাপূজা উদ্‌যাপিত হচ্ছে রেঞ্জে: ডিআইজি

যুক্তরাষ্ট্রে মসজিদের পাশে গোলাগুলি, নিহত ১

যুক্তরাষ্ট্রে মসজিদের পাশে গোলাগুলি, নিহত ১

মধ্যপ্রাচ্যের ১২ দেশে মার্কিন নাগরিকদের ভ্রমণ সতর্কতা জারি

মধ্যপ্রাচ্যের ১২ দেশে মার্কিন নাগরিকদের ভ্রমণ সতর্কতা জারি

নিউইয়র্ক বাংলাদেশ সোসাইটি নির্বাচন:

নিউইয়র্ক বাংলাদেশ সোসাইটি নির্বাচন:

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে হামলা, জরুরি সতর্কতা জারি

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে হামলা, জরুরি সতর্কতা জারি

৪৮ ঘণ্টার ধর্মঘট, মণিপুরে থমকে গেছে জনজীবন

৪৮ ঘণ্টার ধর্মঘট, মণিপুরে থমকে গেছে জনজীবন

দোয়ারাবাজারে সাংবাদিকের উপর হামলাকারী মাদক সম্রাট আহাদ ভূইয়ার সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন

দোয়ারাবাজারে সাংবাদিকের উপর হামলাকারী মাদক সম্রাট আহাদ ভূইয়ার সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন

পদত্যাগ হলো বর্তমান সরকারের সর্ট ট্রাম প্যারাসিটামল থেরাপি -হাসনাত আব্দুল্লাহ এমপি

পদত্যাগ হলো বর্তমান সরকারের সর্ট ট্রাম প্যারাসিটামল থেরাপি -হাসনাত আব্দুল্লাহ এমপি

Bengal Times

বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬


শ্রেণিকক্ষের চক-ডাস্টার নাকি ইউনিয়ন পরিষদ: কোথায় যাবেন এমপিও শিক্ষক?

প্রকাশের তারিখ : ২০ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

একটি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক গতিশীলতা ও শিক্ষার মান নিশ্চিত করার পেছনে দুই ধরনের কাঠামোর ভূমিকা অনস্বীকার্য—একদিকে তৃণমূলের উন্নয়ন ও স্থানীয় সেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য ‘স্থানীয় সরকার’, অন্যদিকে জাতির ভবিষ্যৎ গঠন ও মানবসম্পদ তৈরির জন্য ‘শিক্ষা ব্যবস্থা’। কিন্তু সম্প্রতি এই দুই ব্যবস্থার সংযোগস্থলে তৈরি হয়েছে এক গভীর নীতিগত বিভ্রান্তি ও সাংঘর্ষিক বিতর্ক। এমপিওভুক্ত (Monthly Pay Order) বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন কি না—এ নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের ভিন্নমুখী বক্তব্য এবং রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রখর প্রতিক্রিয়া দেশজুড়ে এক বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
​কয়েক দিন আগে আইনমন্ত্রীর এক বক্তব্যে শিক্ষকদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পক্ষে ইতিবাচক ইঙ্গিত মিললেও, শিক্ষামন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়িছিলেন যে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন না। তবে ইদানিং শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে না।আবার স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর কণ্ঠে শোনা গেছে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের স্থানীয় নির্বাচন করতে বাধা নেই‌। এরই মাঝে বিরোধী রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে শিক্ষকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাধা দিলে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। সরকারের ভেতরে নীতিগত ঐক্যের এই অভাব কেবল প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে না, বরং তৃণমূলের শিক্ষা ও স্থানীয় শাসনের সামগ্রিক শৃঙ্খলাকেও হুমকির মুখে ফেলছে।
​প্রশ্ন হলো, একজন শিক্ষক যদি একই সঙ্গে স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি (যেমন: ইউপি চেয়ারম্যান, সদস্য, পৌরসভার মেয়র বা কাউন্সিলর) হন, তবে তিনি কোন আইনি কাঠামো ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতা মানবেন?
​আইনি ও বিধিমালার দিকটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন নীতিমালার অধীন পরিচালিত দুটি আলাদা জগত। এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা ‘বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা’ এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশাবলী দ্বারা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। এই বিধিমালা অনুযায়ী, একজন শিক্ষককে প্রতিদিন সকাল ৯টা বা সাড়ে ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সার্বক্ষণিকভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে হয়। প্রাত্যহিক সমাবেশ পরিচালনা, ডিজিটাল বা বায়োমেট্রিক হাজিরা প্রদান, নির্ধারিত পাঠ পরিকল্পনা অনুযায়ী দিনে ৩ থেকে ৫টি ক্লাস নেওয়া, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, উত্তরপত্র মূল্যায়ন, এবং টিফিন ও ছুটির সময়ে শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা বজায় রাখা তাদের অর্পিত মূল দায়িত্ব।
​এর বিপরীতে, স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত একজন জনপ্রতিনিধি—তিনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা সদস্য হোন কিংবা পৌরসভার মেয়র বা কাউন্সিলর হোন—তাকেও সার্বক্ষণিক জনসেবায় নিয়োজিত থাকতে হয়। নাগরিকত্ব সনদ প্রদান, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, ভিজিডি-ভিজিএফ বা বয়স্ক ভাতার তালিকা তৈরি, স্থানীয় শালিস-বিচার, ড্রেনেজ ও রাস্তাঘাট সংস্কার তদারকি এবং জরুরি দুর্যোগে ত্রাণ বিতরণের মতো কাজে তাকে প্রতিনিয়ত ইউনিয়ন পরিষদ বা নগর ভবনে উপস্থিত থাকতে হয়।
​সম্প্রতি কুড়িগ্রাম জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি ও প্রবীণ শিক্ষাবিদ অধ্যাপক লিয়াকত আলী এ প্রসঙ্গে অত্যন্ত যৌক্তিক এক প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, প্রতিটি মন্ত্রণালয় নিজস্ব সংবিধিবদ্ধ বিধিতে চলে। এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অনুশাসনে চলেন না; তারা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাধ্যবাধকতায় থাকেন। একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে প্রতিনিয়ত পরিষদের কার্যালয়ে বসতে হয় ও স্থানীয় জনগণের তদারকি করতে হয়। যদি একজন এমপিওভুক্ত শিক্ষক জনপ্রতিনিধি হন, তবে তিনি কীভাবে বিদ্যালয়ের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা বজায় রাখবেন? আর যদি কর্মঘণ্টা না মানেন, তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিধিমোতাবেক তাঁর এমপিও বাতিল এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে। অর্থাৎ, শিক্ষকতা পেশায় থেকে জনপ্রতিনিধি হওয়ার চেষ্টা নীতিগতভাবেই একটি স্ববিরোধিতা। এখন দেখার বিষয় শ্রেণিকক্ষের চক-ডাস্টার নাকি ইউনিয়ন পরিষদ: কোথায় যাবেন এমপিও শিক্ষক?

​এখানে একটি আর্থিক বিষয়ও লক্ষ্যণীয়। সম্প্রতি নতুন জাতীয় বেতন কাঠামোর যে বিশ্লেষণ সামনে এসেছে, তাতে দেখা যায় এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন ও সামাজিক মর্যাদায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি নিশ্চিত করা হচ্ছে। সহকারী শিক্ষক থেকে শুরু করে উচ্চমাধ্যমিক ও ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষদের মূল বেতন আগের তুলনায় দ্বিগুণ বা প্রায় শতভাগ বৃদ্ধির প্রস্তাব রয়েছে। যেখানে রাষ্ট্র শিক্ষক সমাজকে পূর্ণাঙ্গ সামাজিক মর্যাদা ও উপযুক্ত আর্থিক নিরাপত্তা দেওয়ার পথে হাঁটছে, সেখানে একজন শিক্ষকের একই সময়ে অপর একটি নির্বাহী বা রাজনৈতিক পদে আসীন হওয়ার চেষ্টা কতটুকু যৌক্তিক?
​একই মানবদেহে দুটি ভিন্ন দায়িত্বের বোঝা চাপিয়ে দিলে কোনোটিই সুচারুভাবে সম্পাদিত হতে পারে না। যদি একজন শিক্ষক জনপ্রতিনিধি হিসেবে দিনের সিংহভাগ সময় রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক কাজে ব্যয় করেন, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ শিক্ষার্থীরা, ব্যাহত হবে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান। আবার যদি তিনি স্কুলে সময় দেন, তবে স্থানীয় সরকারের সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ তাদের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা ও সেবা থেকে বঞ্চিত হবে।
​আইনের কোনো অস্পষ্টতা বা ব্যাখ্যার মারপ্যাঁচে ফেলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে রাজনীতির আখড়ায় পরিণত করার সুযোগ রাখা কোনো সুস্থ শিক্ষা ব্যবস্থার লক্ষণ হতে পারে না। রাজনৈতিক ফায়দা বা তাৎক্ষণিক সমাধানের কথা না ভেবে, সরকারের উচিত অবিলম্বে একটি সুস্পষ্ট, দ্ব্যর্থহীন ও জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন করা। যদি এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা স্থানীয় সরকার বা অন্য যেকোনো নির্বাচনে অংশ নিতে চান, তবে তাদের প্রথমাংশে শিক্ষকতা পদ থেকে পদত্যাগ বা নিয়ম অনুযায়ী লিয়েন/ছুটি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত।
​শ্রেণিকক্ষের চক-ডাস্টার এবং ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভার নির্বাহী চেয়ার—দুটিই অত্যন্ত দায়িত্বপূর্ণ স্থান। এই দুই ব্যবস্থার মধ্যে দেয়াল তুলে দেওয়াই শিক্ষা ও স্থানীয় শাসন—উভয়ের স্বকীয়তা ও শৃঙ্খলা রক্ষার একমাত্র পথ।


Bengal Times

Publisher: Bengaltimes LLC, USA.
Editor: Masud Alam Chowdhury

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।
শ্রেণিকক্ষের চক-ডাস্টার নাকি ইউনিয়ন পরিষদ: কোথায় যাবেন এমপিও শিক্ষক?
0:00 / 0:00
1x