হায়দার আলী চট্টগ্রাম:
চট্টগ্রামে প্রায় ৯৩ বছরের পুরনো কালুরঘাট সেতু সংস্থার করছে রেলওয়ে। এ সংস্কার কাজের জন্য ৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম-দোহাজারী-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল শুরুর আগে এ সেতু মজবুত করার জন্য এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেতুর সংস্কার কাজ চলাকালীন সময়ে সেতু দিয়ে ট্রেনসহ সকল যান চলাচল বন্ধ থাকবে। যানবাহন পারাপারের জন্য কর্ণফুলী নদীতে ৩ টি ফেরি প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এরই মধ্যে ২১ জুলাই (শুক্রবার) সড়ক ও জনপথ বিভাগ আনুষ্ঠানিক ভাবে ফেরি সার্ভিস উদ্বোধন করা হয়। ২২ জুলাই (শনিবার) সন্ধ্যা পর্যন্ত ফরি চলাচল শুরু হয়নি। ইতিমধ্যে ফেরি চলাচল কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ করা হয়েছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এর পরামর্শক বোর্ডের সুপারিশ অনুযায়ী এ সেতুর সংস্কার করা হচ্ছে। এ সংস্কার কাজ শেষ করতে ৩ মাসেরও বেশি সময় লাগতে পারে।
রেলওয়ে সুত্রে জানা যায়, “৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে সেতুর সংস্কার কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। বুয়েটের পরামর্শক দলের সুপারিশ মতে সংস্কার করা হচ্ছে। বর্তমানে কালুরঘাট সেতু দিয়ে চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেললাইনে ১০ কিলোমিটার গতিতে ১০ টনের ভারী ইঞ্জিন চলাচল করে। চট্টগ্রাম-দোহাজারী-কক্সবাজার গামী ট্রেনের গতি হবে প্রায় ৮০-১০০ কিলোমিটার। এসব ইঞ্জিনের ওজন হবে প্রায় ১২-১৫ টন। একারণে রেল যোগাযোগের সুবিধার জন্য এ সেতুর সংস্কার কার্যক্রম শুরু হচ্ছে।”
সড়ক ও রেলপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী পিন্টু চাকমা বলেন, “সংস্কার কাজ চলাকালীন সময়ে ফেরি সার্ভিস চালু থাকবে। ফেরিতে কোন ধরনের যানবাহনে কত টাকা ভাড়া হবে তা নিধারিত করে দেওয়া হয়েছে। তবে কখন থেকে সেতুর সংস্কার কার্যক্রম শুরু হবে তা জানা নেই।”
সুত্রে আরও জানা যায়, “২০০৪ সালের ১৩ আগষ্ট ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে এ সেতুর সংস্কার কাজ করা হয়েছিল। এরপর ২০১২ সালে আরেকবার সংস্কার করা হয়েছিল। বর্তমানে কালুরঘাট সেতুর উপর দিয়ে কক্সবাজার গামী ট্রেনের ১২-১৫ টন ওজনের ইঞ্জিন ও ৮০-১০০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চালানো সম্ভব হবে না। অন্তত ৪০-৫০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা যায়। এজন্য বুয়েটের পরামর্শক দলের সুপারিশ অনুযায়ী এ সেতুর সংস্কার করা হচ্ছে।”
এ প্রসঙ্গে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহা ব্যবস্থাপক (জিএম) মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, “কালুরঘাট সেতুর সংস্কার কাজের নিয়োগ কৃত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এ মাসেই সংস্কার কাজ শুরু করার কথা ছিল। কবে থেকে কাজ শুরু হচ্ছে সে দিন তারিখ এখনও আমাদেরকে জানানো হয়নি। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সেতুর সংস্কার কাজের জন্য প্রয়োজনীয় মালামাল আনা শুরু করেছে। শীঘ্রই কাজ শুরু হবে বলে আশা করছি।”
রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের প্রধান ভু-সম্পত্তি কর্মকর্তা সুজন চৌধুরী বলেন, “কালুরঘাট সেতুর সংস্কারে নিয়োগ দেওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের যে পরিমাণ সংস্কার কাজ রয়েছে, তা শেষ করতে ৬ মাস লাগতে পারে বলে রেলওয়েকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছে। তবে আরও আগে কাজ শেষ করার জন্য তাগাদা দেওয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী কাজ শেষ হবে।”
দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্প পরিচালক মফিজুর রহমান বলেন, “চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের মধ্যে আমারা দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইনের চলমান কাজ শেষ করে ট্রেন চলাচল উদ্বোধনের আশা করছি। ইতিমধ্যেই ১০০ কিলোমিটার রেললাইনের মধ্যে ৮২ কিলোমিটার রেললাইন বসানোর কাজ শেষ হয়েছে। রেললাইনের ওপর থাকা সকল ছোট-বড় ব্রিজ ও কালভার্টের কাজও শেষ হয়েছে। এখন মেকানিকালের কাজ চলছে। যা প্রকল্পের অগ্রগতির ৮৬ শতাংশ।”
সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মোঃ নিজাম উদ্দিন বলেন, “কালুরঘাট সেতুর নিচে যে ৩ টি ফেরি প্রস্তুত রাখা হয়েছে তার মধ্যে প্রথমে ২ টি চলাচল করবে। যানবাহনের চাপ বাড়লে অপরটিও চালানো হবে। সংস্কার কাজ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে ফেরিও চালু হয়ে যাবে।”
“২০১১ সালের ৩ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার এবং রামু-ঘুমধুম পর্যন্ত মিটারগেজ রেলপথ নির্মাণ কাজের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। এরমধ্যে চট্টগ্রাম-দোহাজারী থেকে রামু পর্যন্ত ৮৮ কিলোমিটার ও রামু থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার উদ্বোধনের প্রায় ৭ বছর পর ২০১৮ সালে ডুয়েলগেজ ও সিঙ্গেল ট্র্যাক রেললাইন প্রকল্পের নির্মাণ কাজের শুরু হয়। দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার পর্যন্ত ১০০ কিলোমিটার রেলপথ প্রকল্পের নির্মাণ কাজের ব্যয় প্রথমে এক হাজার কোটি টাকা ধরা হয়। ২০১৬ সালে রেলপথ প্রকল্প প্রস্তাব সংশোধন করে ব্যয় বেড়ে ১৮ হাজার ৩৪ কোটি ৪৭ লক্ষ টাকা। এর মধ্যে অর্থায়ন করেছে এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংক এবং বাংলাদেশ সরকার।”
রেলওয়ে সুত্রে জানা যায়, “১৯৩০ সালের কর্ণফুলী নদীর উপর ২৩৯ মিটার দৈর্ঘ্যের কালুরঘাট সেতুটি নির্মাণ করে ব্রুনিক এন্ড কোম্পানি ব্রিজ বিল্ডার্স হাওড়া নামে সেতু নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মিয়ানমারের (বার্মা)র সাথে রেলপথে যোগাযোগের জন্য এই সেতু নির্মাণ করা হয়েছিল। যদিও পরে এ রেললাইন দোহাজারী পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়।”
বর্তমানে কালুরঘাট সেতুর উপর দিয়ে ট্রেনের পাশাপাশি বোয়ালখালী ও পটিয়া গামী যানবাহনও চলাচল করে। সেতুর উপর দিয়ে ট্রেন চলাচলের সময় অন্য যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকে। একমুখী যানবাহন চলাচলের কারণে প্রায় সময়ই যানজট লেগেই থাকে।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) চট্টগ্রাম অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ জাহেদ হোসেন বলেন, “অর্থ মন্ত্রনালয় ফেরির টোল হার অনুমোদন দিয়েছে। অনুমোদিত তথ্যনুযায়ী; ট্রেইলারের জন্য ৫৬৫ টাকা, ভারী ট্রাক বা কাভার্ড ভ্যানের জন্য ৪৫০ টাকা, মাঝারি ট্রাকের জন্য ২২৫ টাকা, বড় বাসের জন্য ২০৫ টাকা, ছোট ট্রাকের জন্য ১৭০ টাকা, পাওয়ার টিলার বা ট্রাক্টরের জন্য ১৩৫ টাকা, মিনি বাসের জন্য ১১৫ টাকা, মাইক্রোবাস ও পিক-আপের জন্য ৯০ টাকা, প্রাইভেট কারের জন্য ৫৫ টাকা, ব্যাটারি চালিত ৩ ও ৪ চাকার গাড়ির জন্য ২৫ টাকা, মোটরসাইকেলের জন্য ১০ টাকা এবং রিকশা-ভ্যান-বাইসাইকেল ও ঠেলাগাড়ির জন্য ৫ টাকা করে টোল দিতে হবে।
কালুরঘাট সেতুর সংস্কারের জন্য বুয়েটের পরামর্শ অনুযায়ী গত ১৮ জুন ম্যাক্স ইন ফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। প্রাথমিক সংস্কার ব্যয় প্রায় ৪৩ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। সংস্কারের পরে কালুরঘাট সেতু দিয়ে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আমদানিকৃত উচ্চ গতির কোচসহ ১৫ এক্সেল লোডের ইঞ্জিন নিয়ে ট্রেনযোগে কক্সবাজারে যাওয়ার উপযোগী করে তোলা হবে।”