প্রিন্ট এর তারিখ : ০২ নভেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০২ নভেম্বর ২০২৬
অভাব ঠেলে কুড়িগ্রামের রাজারহাটের যমজ দুই বোনের জিপিএ-৫ অর্জন
সাইফুর রহমান শামীম, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:
সাইফুর রহমান শামীম, কুড়িগ্রাম:শ্রবণপ্রতিবন্ধী বাবার বেকারত্ব, সংসারে নিত্যদিনের অভাব-অনটন আর শত সীমাবদ্ধতাকে পেছনে ফেলে এইচএসসি পরীক্ষায় দারুণ সাফল্য অর্জন করেছে কুড়িগ্রামের রাজারহাটের যমজ দুই বোন রহিমা সরদার ও রাবেয়া সরদার। মানবিক বিভাগ থেকে দুজনই জিপিএ-৫ পেয়ে এলাকায় তাক লাগিয়ে দিয়েছে।
উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের রামকার্জি গ্রামের এই দুই বোন রাজারহাট সরকারি মীর ইসমাইল হোসেন কলেজের শিক্ষার্থী। কলেজ সূত্রে জানা গেছে, এ বছর তাদের কলেজ থেকে ১৪২ জন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় পাস করেছে, যার মধ্যে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে কেবল এই দুই বোন। শুধু তাই নয়, রাজারহাট উপজেলার সাতটি কলেজ, তিনটি স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং চারটি কারিগরি প্রতিষ্ঠানসহ মোট ১৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে একমাত্র এই যমজ বোনই জিপিএ-৫ অর্জনের গৌরব অর্জন করেছে। তাদের এই অদম্য সাফল্যে আনন্দিত শিক্ষক, প্রতিবেশীসহ স্থানীয়রা।
সংগ্রামের পারিবারিক চিত্র:রহিমা ও রাবেয়ার বাবা মনির হোসেন সরদার রিজু এবং মা নাসিমা বেগম। এই দম্পতির তিন মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ের ইতোমধ্যে বিয়ে হয়েছে। বাবা মনির হোসেনের স্থায়ী কোনো কাজ নেই। অল্প কিছু কৃষি জমি আর অনিয়মিত কৃষি শ্রমিক হিসেবে কাজের আয় দিয়েই এতদিন কোনোমতে সংসার চলেছে। সীমিত আয়ে তিন মেয়ের পড়ালেখার খরচ জোগাতে তাদের চরম বেগ পেমতে হয়েছে। তবে মেয়েদের পড়াশোনার অদম্য আগ্রহে তারা কখনো বাধা দেননি।
আবেগাপ্লুত মা নাসিমা বেগম বলেন, “এমন খুশি জীবনে আর কখনো হইনি। ওদের মুখে আনন্দের হাসি দেখেই বুকটা ভরে যায়। তবে এর পেছনের কষ্টের লড়াই দীর্ঘদিনের। আমার স্বামী সড়ক বিভাগে চাকরি করতেন, কিন্তু ২০০২ সালে চাকরি হারানোর পর থেকে তিনি বেকার। আমাদের দুই বিঘা জমির এক অংশে সুপারি বাগান, অন্য অংশে শাকসবজি চাষ করি। এছাড়া হাঁস-মুরগি লালন-পালন করি। এই আয়েই খাওয়া-পরা, চিকিৎসা ও পড়ালেখার খরচ চালাতে নুন আনতে পান্তা ফুরানোর দশা হয়।”
সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছিলেন যারা:অভাবের তাড়নায় পড়ালেখা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলেও স্থানীয়দের সহযোগিতায় পথ খুঁজে পায় দুই বোন। মা নাসিমা বেগম জানান, স্থানীয় প্রাইভেট শিক্ষক মোসলেম উদ্দিন, আহসান হাবিব ও সোহেল স্যার তাদের বিনা পারিশ্রমিকে পড়িয়েছেন। এছাড়া কলেজের অধ্যক্ষ ভর্তি, ফরম পূরণসহ বিভিন্ন পরীক্ষার ক্ষেত্রে নামমাত্র ফি নিয়েছেন এবং তারা উপবৃত্তিও পেয়েছে। সবার সম্মিলিত সহযোগিতাই এই সাফল্যের বড় চালিকাশক্তি ছিল বলে জানান তিনি।
ভবিষ্যৎ স্বপ্ন ও লক্ষ্য:
বাবার কষ্ট কিছুটা লাঘব করতে এবং নিজেদের স্বপ্ন পূরণে গভীর রাতেও পড়াশোনায় ব্যস্ত থাকতেন রহিমা ও রাবেয়া। ঘুমাতেও খুব সীমিত সময় পেতেন তারা। যমজ দুই বোন জানায়, তাদের এখন মূল লক্ষ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে বাবার স্বপ্ন পূরণের প্রথম ধাপ অর্জন করা। পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষা শেষ করে তারা শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হতে চান। সেই লক্ষ্যে বর্তমানে বিভিন্নজনের সহযোগিতায় রংপুরে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির কোচিং করছেন তারা। সবার দোয়া ও সহযোগিতা কামনা করেছেন এই দুই অদম্য শিক্ষার্থী।
যা বললেন কলেজের অধ্যক্ষ:রাজারহাট সরকারি মীর ইসমাইল হোসেন কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মুহা. জহুরুল ইসলাম বলেন, “উপজেলার ১৪টি কলেজের মধ্যে এই যমজ দুই বোনই মানবিক শাখা থেকে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে। নানা সংকটের মধ্যেও রহিমা ও রাবেয়ার এমন সাফল্যে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত। তাদের এই অর্জন এলাকার অন্যান্য শিক্ষার্থীদেরও পড়ালেখায় মনোযোগী হতে এবং স্বপ্ন পূরণে সাহস জোগাবে।” কলেজের পক্ষ থেকেও তাদের আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানানো হয়েছে।
Publisher: bengaltimes LLC, USA.
|
Editor: Masud Alam Chowdhury
Editor Office: 117, Manchester Ave, Paterson, New Jersey, Postcode: 07502, US - United States.
Email: editorbengaltimes@gmail.com, newsbengaltime@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।