উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
গলাচিপা (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি
রাতের অন্ধকারে নদীতে জাল ফেলা তো হচ্ছেই, দিনের আলোতেও নৌকা নিয়ে প্রকাশ্যে চলছে ইলিশ শিকার। কোথাও নির্দিষ্ট ক্রেতার ফোন পেয়ে ব্যাগে ভরে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে নিষিদ্ধ সময়ের ধরা মাছ, আবার কোথাও অপরিচিত কেউ ইলিশ কিনতে চাইলে আগে যাচাই করা হচ্ছে তার নাম-পরিচয়। এমনকি সরাসরি মাছ না দিয়ে নির্ধারিত স্থানে টাকা রেখে যাওয়ার মতো কৌশলও অবলম্বন করছে অবৈধ কারবারিরা। মা ইলিশ রক্ষায় নদী ও সাগরে সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকলেও পটুয়াখালীর গলাচিপায় এমন চিত্রে প্রশ্ন উঠছে অভিযানের কার্যকারিতা নিয়ে।
গলাচিপা উপজেলার বিভিন্ন এলাকা সরেজমিন ঘুরে এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রশাসনের অভিযান কিংবা শাস্তির ভয় কোনোটিই থামাতে পারছে না ইলিশ শিকার ও গোপন কেনাবেচা। স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ও দালালচক্রের সহযোগিতায় নির্দিষ্ট ক্রেতাদের সাথে প্রতিনিয়ত চলছে এই অনৈতিক কারবার।
স্থানীয় সূত্র জানায়, উপজেলার অন্তত ১০ থেকে ১৫টি পয়েন্টে নিয়মিত ইলিশ কেনাবেচা চলছে। ফোনে যোগাযোগ করলেই হোম ডেলিভারির মতো ব্যাগে করে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে ইলিশ। তবে নিরাপত্তার অজুহাতে অপরিচিতদের কাছে মাছ বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন বাসিন্দা জানান, চক্রটির বিরুদ্ধে কেউ কথা বলার সাহস পান না। এমনকি মাছ ধরতে যাওয়া কিংবা ফেরার সময় ছবি বা ভিডিও ধারণ রোধে মোবাইল ব্যবহারে কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করে রাখা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চরকাজল ইউনিয়নের লঞ্চঘাট, চরশিবা লঞ্চঘাট, বড় শিবা; চরবিশ্বাস ইউনিয়নের চরআগস্তি, জিমতলা, নোমোর স্লুইসগেট, আমড়াগাছিয়া, চরবাংলা খেয়াঘাট; রতনদী তালতলী ইউনিয়নের বন্যাতলী ও পাতাবুনিয়া স্লুইসগেট; সদর ইউনিয়নের চরকারফারমা; পানপট্টি লঞ্চঘাট, বটতলা বাজার, বোয়ালিয়া, পক্ষিয়া, লোন্দা স্লুইসগেট এবং গলাচিপা-পাটুয়া খেয়াঘাটসহ বিভিন্ন স্থানে গোপনে ইলিশ শিকার ও বিক্রি চলছে। এছাড়া রামনাবাদ নদী, তেঁতুলিয়া নদীর বিভিন্ন পয়েন্ট এবং আগুনমুখার মোহনায় রাতের আঁধারে বেপরোয়া জাল ফেলা হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, নদীর পাড়ে পাহারায় থাকে জেলেদের নিজস্ব লোক। প্রশাসনের টহল বোট দেখা মাত্রই সংকেত পাঠানো হয়। খবর পাওয়া মাত্র উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ইঞ্জিনের নৌকা নিয়ে জেলেরা তীরবর্তী ধানক্ষেত বা বনে গা-ঢাকা দেয়। ইতোমধ্যে এসব ঘটনার বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে।
নদীতে অভিযান চালাতে গিয়ে প্রশাসনকে বাধার মুখেও পড়তে হচ্ছে। সম্প্রতি চরবিশ্বাস ইউনিয়নের নোমোর স্লুইস এলাকায় অভিযান চলাকালে সংঘবদ্ধ একটি চক্র প্রশাসনের ট্রলারের দিকে তেড়ে আসে এবং ইটপাটকেল ছুঁড়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার চেষ্টা করে।
উপজেলা মৎস্য দপ্তর সূত্রে জানা যায়, নিষেধাজ্ঞার প্রথম ১২ দিনে ৩৮টি অভিযান ও ৪টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। অভিযানে ২৮৫ কেজি ইলিশ এবং ১ লাখ ৭২৫ মিটার জাল জব্দ করা হয়, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ২৬ লাখ ৯৪০ টাকা। এছাড়া ১২টি মামলায় ৬ জন জেলেকে কারাদণ্ড ও ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
এ বিষয়ে গলাচিপা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ভিক্টর বাইন জানান, ‘মৎস্য অফিসসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিভাগের সমন্বয়ে যৌথ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। প্রতিদিন একাধিক টহল দেওয়া হচ্ছে। গলাচিপার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে অনেক এলাকা দুর্গম হওয়ায় তাৎক্ষণিক পৌঁছানো কঠিন হলেও আমরা তৎপর রয়েছি।’
নোমোর স্লুইস এলাকায় বাধার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘দুর্গম এলাকায় অভিযান চলাকালে একটি চক্র বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। মা ইলিশ রক্ষায় আমাদের এই কঠোর অবস্থান অব্যাহত থাকবে।’