উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
সাইফুর রহমান শামীম, কুড়িগ্রাম:
রাজনৈতিক পরিচয় ও পদোন্নতি বঞ্চিত নেতা পরিচয়ের আড়ালে বেপরোয়া নিয়োগ বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়কে দুর্নীতির অভয়ারণ্যে পরিণত করার অভিযোগ উঠেছে উপাচার্য (ভিসি) প্রফেসর ড. মুহ: রাশেদুল ইসলামের বিরুদ্ধে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) বিদ্যমান নীতিমালা তোয়াক্কা না করে স্বজনপ্রীতি ও নিয়মবহির্ভূত নিয়োগের ঘটনায় চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে কুড়িগ্রামের সচেতন মহলে।
এমএস শেষ হওয়ার আগেই প্রভাষক নিয়োগ:
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ইউজিসির বিধি অনুযায়ী প্রভাষক পদে আবেদনের জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতকোত্তর (এমএস) ডিগ্রি থাকা বাধ্যতামূলক হলেও তা তোয়াক্কা করা হয়নি। ফিশিং অ্যান্ড হার্ভেস্ট বিভাগে মো. আহসানুল হক এবং ফিসারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিক্স বিভাগে মরিয়ম আক্তারকে মাস্টার্স সম্পন্ন হওয়ার আগেই প্রভাষক হিসেবে এডহক ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। নথিপত্র অনুযায়ী, আহসানুল হক ২০২৫ সালের অক্টোবরে এবং মরিয়ম আক্তার ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এমএস ডিগ্রি অর্জন করলেও, তাদের চাকরিতে যোগদান দেখানো হয়েছে যথাক্রমে একই বছরের ফেব্রুয়ারি ও সেপ্টেম্বর মাসে। এছাড়া ২৬টি বিভাগে শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলেও কোনো বাছাই কমিটি ছাড়াই ইতোমধ্যে ৮ জনকে এডহক ভিত্তিতে পছন্দের ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
ভাগ্নে-ভাগ্নি ও নিকটাত্মীয়দের বড় পদায়ন:
নিয়োগে স্বজনপ্রীতির ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে। নির্ধারিত বয়সসীমা পার হওয়া সত্ত্বেও উপাচার্য তার আপন বোন ও আত্মীয়দের প্রশাসনিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়েছেন:
মো. আতিকুর রহমান (৩৬): উপাচার্যের আপন বোনের ছেলে; নিয়োগ পেয়েছেন ভিআইপি পদ ‘পিএস টু ভিসি’ (সেকশন অফিসার) হিসেবে।
মোছা. রেজভীন বেগম (৩৪): বোনের ছেলে/মেয়ে সম্পর্কের আত্মীয়; সহকারী স্টোর কিপার।
মো. গোলাম মোস্তফা: সেকশন অফিসার (পরীক্ষা বিভাগ)।
অন্যান্য আত্মীয়: আপন বোনের মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস (সেকশন অফিসার - খামার), আপন শ্যালক মো. আব্দুল্লাহ-আল সোহাগ (সেকশন অফিসার), ফুফা শ্বশুরের ছেলে রাইয়্যান রেজা (ইনভাইরনমেন্টাল সাইন্স) এবং ফুফাতো ভাইয়ের ছেলে মো. রায়হান সরকার (অফিস সহকারী)।
শ্যালকের হাতে টেন্ডার ও নিয়োগের নিয়ন্ত্রণ:
অভিযোগ রয়েছে, এসব অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেন নির্বিঘ্নে পরিচালনা করতে উপাচার্য তার আপন শ্যালক আব্দুল্লাহ-আল সোহাগকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বময় ক্ষমতা দিয়েছেন। টেন্ডার থেকে শুরু করে আগামী নিয়োগের অগ্রিম লেনদেন শ্যালকের মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। এছাড়া হঠাৎ কোনো তদন্ত থেকে বাঁচতে ব্যক্তিগত ফাইলপত্র রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে না রেখে উপাচার্য নিজের কাছে জিম্মি করে রেখেছেন।
ক্যাম্পাসে অনুপস্থিতি ও ঢাকায় বসে অফিস:
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী হিসেবে সার্বক্ষণিকভাবে ক্যাম্পাসে অবস্থানের বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা মানছেন না ভিসি। তথ্য অনুযায়ী, বিগত ৩ ৩৩ দিনের মধ্যে তিনি মাত্র ৪২ দিন ক্যাম্পাসে উপস্থিত ছিলেন। ঢাকার গেস্ট হাউসকে মূল কার্যালয় বানিয়ে সেখান থেকেই দূরনিয়ন্ত্রিতভাবে কাজ চালাচ্ছেন, যার ফলে প্রশাসনিক স্থবিরতা নেমে এসেছে। ফিজিবিলিটি স্টাডির প্রায় ৫ কোটি টাকা তড়িঘড়ি করে তুলে নেওয়া, নিম্নমানের জিনিসপত্র কেনাকাটা এবং ভর্তি পরীক্ষার ফান্ড পকেটস্থ করার মতো গুরুতর অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
সংশ্লিষ্টদের প্রতিক্রিয়া:
উপাচার্যের এসব অনিয়মে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বিএনপি নেতা ও বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুললেক। তিনি বলেন, “অবহেলা দূর করতে কুড়িগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয় করা হয়েছে। এখানকার মানুষ সুযোগ পাবে না, আর উনি স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি করবেন—এটা হতে পারে না। কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি আমরা মেনে নেব না।”
কুড়িগ্রাম সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সভাপতি রওশন আরা চৌধুরী বলেন, “স্বজনপ্রীতি করা স্পষ্টত দুর্নীতির সামিল। সরকারের উচিত অবিলম্বে সঠিক তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া, যাতে কোনো ব্যক্তির কারণে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন না হয়।”
অভিযোগের জবাবে উপাচার্য:
এসব বিষয়ে কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মুহঃ রাশেদুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি স্বজনপ্রীতির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম সচল রাখার স্বার্থে সম্পূর্ণ সাময়িকভাবে যোগ্যদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির পর চূড়ান্ত বাছাই করে স্থায়ী পদে নিয়োগ সম্পন্ন করা হবে।”
তবে বিষয়ে জানতে ইউজিসির চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মামুন আহমেদের সাথে একাধিকবার মোবাইলে যোগাযোগ করা হলেও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।