প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৪ অক্টোবর ২০২৬
সাইফুর রহমান শামীম, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:
চারদিকে ব্রহ্মপুত্র নদ। দুর্গম রহমতপুর দেবারিখোলা অষ্ট আশির চরের শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার একমাত্র ভরসা ‘খেওয়ার আলগা চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’। তবে সরকারি কোনো নিয়মকানুন তোয়াক্কা না করে রাতের আঁধারে সেই বিদ্যালয় ভবনটি ভেঙে লুটপাট করার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় ইউপি সদস্য ছাইফুর রহমান ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে।
গত ১ অক্টোবর ভবনটি ভেঙে ফেলার পর থেকে শ্রেণিকক্ষ ও স্বাভাবিক পাঠদান কার্যক্রম নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যেই গত ১২ অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছে পঞ্চম শ্রেণির মডেল টেস্ট পরীক্ষা। কিন্তু কোনো বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় খোলা আকাশের নিচে, গাছের তলায় বেঞ্চ বসিয়ে পরীক্ষা দিতে বাধ্য হচ্ছে কোমলমতি শিশুরা। এতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মনে চরম ক্ষোভ ও দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি অর্থে নির্মিত একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কীভাবে যথাযথ অনুমোদন ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে ভেঙে ফেলা হলো?
স্থানীয় অধিবাসীদের অভিযোগ, নদীভাঙনের অজুহাত দেখিয়ে তড়িঘড়ি করে বিদ্যালয় ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়। চার কক্ষের বারান্দাসহ ভবনটি তৈরিতে খরচ হয়েছিল প্রায় ২৬ লাখ টাকা। এছাড়া ২০২৬ সালেই প্রায় ১১ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি নতুন ওয়াশ ব্লক নির্মাণ করা হয়েছিল, যার ইট ও অন্যান্য উপাদানও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। মোট ৩৭ লাখ টাকার এই সরকারি সম্পদ অপসারণের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকি ও সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আবু বকর, সাহেব আলী ও রোস্তম মিয়া অভিযোগ করে বলেন, "নদীভাঙনের কথা বলা হলেও স্কুলের আশপাশে থাকা বেশ কিছু বাড়িঘর এখনো একদম অক্ষত রয়েছে। এমনকি বিদ্যালয়ের সাবেক সহসভাপতি আনোয়ার হোসেন ও অভিযুক্ত ইউপি সদস্য ছাইফুর রহমানের বাড়িও নিরাপদ রয়েছে। ফলে স্কুল ভাঙার প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে আমাদের সন্দেহ রয়েছে। ভাঙা টিন-ইটের কিছু অংশ পাশে রেখে বাকিগুলো নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার নাটক সাজিয়েছেন ছাইফুর মেম্বার। আমরা এই ঘটনায় সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্ত চাই।"
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জাহানারা বেগম জানান, "কমিটির সদস্য ছাইফুর মেম্বার লোকজন নিয়ে বিদ্যালয়টি ভেঙেছেন। অপসারণ করা ইট, লোহার এঙ্গেল, সিঁড়ি ও টিন—সবই তিনি নিয়ে গেছেন।" কমিটি গঠন ও কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমোদন ছাড়া কেন ভবনটি ভাঙা হলো—জানতে চাইলে তিনি বলেন, "আমার এতো কিছু জানা নেই।"
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যে প্রস্তাবিত কমিটির তালিকায় ছাইফুর মেম্বারের নাম রয়েছে, সেটিও এখনো জেলা বা উপজেলা থেকে চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি। অথচ তিনি নিজেকে পরিচালনা কমিটির দায়িত্বে দাবি করে ব্যক্তিস্বার্থে স্কুলটি রাতারাতি ভেঙে ফেলেন।
সহকারী শিক্ষক মরিয়ম নিপা বলেন, "বিদ্যালয়ের কোনো অবকাঠামো না থাকায় খোলা আকাশের নিচে গাছের তলায় শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নিতে হচ্ছে। এটি অত্যন্ত কষ্টদায়ক। ভবন ভাঙার সময় আমি নৈমিত্তিক ছুটিতে ছিলাম।"
বিদ্যালয়টির অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নুর ইসলাম বলেন, "এটি একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি না নিয়ে এবং শিক্ষার্থীদের বিকল্প পাঠদানের ব্যবস্থা না করে স্কুল ভাঙা মোটেও ঠিক হয়নি।"
একই সুর ব্যক্ত করেন বিদ্যালয়ের পরিচালনা (অ্যাডহক) কমিটির সদস্য আনোয়ার হোসেন। তিনি অভিযোগ করেন, বিদ্যালয় ভাঙার বিষয়ে তাকে কিছুই জানানো হয়নি।
এদিকে পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও পাছগাছি ক্লাস্টারের দায়িত্বে নিয়োজিত উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাহেদুল ইসলাম স্বীকার করেন, তিনি ইউপি সদস্য ছাইফুর রহমানকে মৌখিকভাবে বিদ্যালয়টি সরানোর কথা বলেছিলেন। তবে কোনো লিখিত আদেশ, সরেজমিনে পরিদর্শন ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া কীভাবে এমন আদেশ দেওয়া হলো—এমন প্রশ্নে তিনি উত্তর না দিয়ে এড়িয়ে যান।
অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ইউপি সদস্য ছাইফুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবু বকর সিদ্দিক বলেন, "অনুমোদন ছাড়া সরকারি বিদ্যালয় ভবন ভাঙা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। এই ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
বিষয়টি সম্পর্কে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহমুদুল হাসান জানান, "অনুমতি ছাড়া খেওয়ার আলগা চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন ভাঙার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হবে। তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।"
চরাঞ্চলের নদীবেষ্টিত এই প্রত্যন্ত এলাকায় শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ এমনিতেই সীমিত। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সরকারি সম্পদ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে হবে এবং চরের কোমলমতি শিশুদের শিক্ষাজীবন রক্ষায় অবিলম্বে বিকল্প শ্রেণিকক্ষ নির্মাণের ব্যবস্থা করতে হবে।