June 23, 2024, 3:01 pm
ব্রেকিং নিউজ

সিলেটে বন্যা ভয়াবহ আকার ধারণ করছে, হুমকির মুখে নগরী

রিপোর্টারের নাম:
  • আপডেট টাইম Thursday, May 30, 2024
  • 31 দেখা হয়েছে

অনলাইন ডেস্ক:

প্রবল ঘূর্ণিঝড় রিমালের রেশ কাটতে না কাটতেই সিলেটে বন্যা দেখা দিয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও গত কয়েক দিনের বৃষ্টিতে সিলেটের নদ-নদীগুলোর পানি বাড়ছে। জেলার পাঁচটি উপজেলায় প্লাবিত হয়েছে শতাধিক গ্রাম। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন তিন লক্ষাধিক মানুষ।

সুরমা-কুশিয়ারা নদীর অন্তত ১৫ স্থানে ডাইক (নদী প্রতিরক্ষা বাঁধ) ভেঙে প্রবল বেগে পানি ঢুকছে লোকালয়ে। এতে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। পানিতে তলিয়ে গেছে জেলার ৫ হাজার ৬০১ হেক্টর জমির ফসল। এমন পরিস্থিতিতে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে সিলেটের সব পর্যটন কেন্দ্র। জেলার গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট ও জকিগঞ্জ বন্যা কবলিত হয়েছে।

পানিতে তলিয়ে গেছে সিলেট-তামাবিল সড়ক। গোয়াইনঘাট উপজেলা সদরের সঙ্গে জেলা সদরের সড়ক যোগাযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। সিলেট নগরীর বেশকিছু এলাকায়ও বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে। নগরীর মাছিমপুর, মেন্দিবাগ, আলমপুর বুধবারই বন্যাকবলিত হয়ে পড়ে। ঝুঁকিতে আছে নগরীর কালীঘাট, শেখঘাট, কাজির বাজারসহ বাণিজ্যিক এলাকাগুলো।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কেএম আব্দুল ওয়াদুদ যুগান্তরকে বলেন, ইতোমধ্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে সিলেটে বন্যা দুর্গতদের সহায়তার জন্য ২০ লাখ নগদ টাকা, জিআর খাত থেকে ৫শ টন চাল বরাদ্দ করা হয়েছে। এছাড়া গোখাদ্য ক্রয়ের জন্য ১০ লাখ এবং শিশুখাদ্য ক্রয়ের জন্য ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে আরও সহায়তা দেওয়া হবে।

সিলেট আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ শাহ মোহাম্মদ সজিব হোসেনের উদ্ধৃতি দিয়ে সিলেট ব্যুরো জানায়, চলতি মাসে সিলেটে বৃষ্টিপাত হয়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। গত বছর মে মাসে ৩৩০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছিল। এবার মে মাসে হয়েছে ৭০৫ মিলিমিটার।

এর আগে ২০২২ সালের প্রলয়ংকরী বন্যার সময়ে মে মাসে সিলেটে ৮৩৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল। পাউবো সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ জানান, সুরমা, কুশিয়ারা, সারি ও গোয়াইন নদীর পানি বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অন্যান্য নদ-নদীর পানিও বাড়ছে।

গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তৌহিদুল ইসলাম জানান, উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের প্রায় ৪২ হাজার ৯০০ পরিবার দুর্যোগকবলিত। এর মধ্যে বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত আশ্রয়কেন্দ্রে ২ হাজার ৩৫৬ জন আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি জানান, মানুষের পাশাপাশি ৬৪৫টি গবাদিপশুর আশ্রয়েরও ব্যবস্থা করা হয়েছে। উপজেলায় ১০টি মেডিকেল টিম চালু করা হয়েছে। কৃষিজমি তলিয়ে গেছে ১ হাজার ৬৬০ হেক্টর।

সিলেটের জেলা প্রশাসক শেখ রাসেল হাসান জানান, পানিবন্দি মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে ও নিরাপদে সরিয়ে আনা হয়েছে। জেলার পাঁচটি উপজেলায় জরুরিভিত্তিতে প্রায় ৪৭০টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। প্রয়োজনে তা বাড়ানো হবে। জেলা প্রশাসন জানায়, জেলায় জরুরিভিত্তিতে ৪৭০টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে।

এরমধ্যে গোয়াইনঘাটে ৫৬টি, জৈন্তাপুরে ৪৮টি, কানাইঘাটে ১৮টি, কোম্পানীগঞ্জে ৩৫টি, জকিগঞ্জে ৫৮টি আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে। বাকি আশ্রয়কেন্দ্রগুলো অন্যান্য উপজেলায় রয়েছে। সিলেটের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক মোহাম্মদ আনিছুজ্জামান জানান, গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট ও জকিগঞ্জে মোট ৫ হাজার ৬০১ হেক্টর আউশ ধান, আউশ বীজতলা ও সবজি খেত তলিয়ে গেছে।

জৈন্তাপুর উপজেলা চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী জানান, বন্যা কবলিত মানুষের জন্য আপাতত শুকনো খাবার জরুরি। আমরা তাই করছি। চাল বরাদ্দ থাকলেও রান্না করে খাওয়ার মতো শুকনো জায়গা নেই। সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ মোবারক হোসাইন জানান, বন্যা পরিস্থিতি গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর উপজেলায় সবচেয়ে বেশি খারাপ। সেখানে স্থানীয়দের সহযোগিতায় উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে উপজেলা প্রশাসন।

গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর উপজেলার জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসন জানায়, আকস্মিক বন্যায় আটকে পড়াদের উদ্ধারে সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, আনসার-ভিডিপি ছাড়াও জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক কর্মী, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, সামাজিক সংগঠন কাজ করছে।

বৃহস্পতিবার বন্যাকবলিত জৈন্তাপুর পরিদর্শন করেন সিলেটের জেলা প্রশাসক শেখ রাসেল হাসান ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহফুজা আক্তার শিমুল। এ সময় সঙ্গে ছিলেন, জৈন্তাপুর উপজেলা চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে সালিক রুমাইয়া, সহকারী কমিশনার (ভ‚মি) ফাতেমা তুজ জোহরা সানিয়া, মডেল থানা অফিসার ইনচার্জ তাজুল ইসলাম পিপিএম।

জৈন্তাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে শালিক রুমাইয়া বলেন, সেনাবাহিনী, বিজিবি, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ উদ্ধার কাজ করছে। আমি সার্বক্ষণিক বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। যুগান্তর প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরÑ

জকিগঞ্জ (সিলেট) : ভারতের বরাক নদী দিয়ে আসা পাহাড়ি ঢলে জকিগঞ্জে সুরমা-কুশিয়ারা নদীর কয়েকটি স্থানে ডাইক ভেঙে অন্ততপক্ষে ৪০-৫০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। গভীর রাতে আকস্মিক ভয়াবহ বন্যায় উপজেলার লোকজন নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটে চলেছেন। বসতঘরে পানি ঢুকে গেছে। গৃহপালিত পশু-পাখি নিয়ে পড়েছেন বেকায়দায়। আবার কেউ কেউ পানিবন্দি অবস্থায় বাড়িতেই অবস্থান করছেন। বৃদ্ধ ও শিশুদের নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন বন্যাকবলিত এলাকাগুলোর মানুষ।

বৃহস্পতিবার দুপুর ২টা পর্যন্ত উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পানি হু হু করে বাড়তে দেখা গেছে। নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। লোকজন অভিযোগ করে বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের গাফলতির কারণে ডাইক ভেঙে বন্যা সৃষ্টি হয়েছে। বর্ষা মৌসুম শুরুর আগে ডাইকের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে মেরামত করা হলে বন্যা থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব ছিল।

জকিগঞ্জ উপজেলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আফসানা তাসনিম জানান, ইতোমধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে প্রধান করে উপজেলায় কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। ৫৫টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রয়েছে। দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত ২২টি পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছে।

গোলাপগঞ্জ (সিলেট) : অবিরাম বৃষ্টিতে সিলেটের গোলাপগঞ্জে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি হু হু করে বাড়ছে। আতঙ্কে রয়েছেন নদীর তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দারা। এদিকে হাকালুকি হাওরের পানিও বৃদ্ধি পেয়েছে। আরও ২-১ দিন বৃষ্টি হলে হাওর ও নদী পাড়ের এলাকাগুলো তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে উপজেলার নিম্নাঞ্চল হিসাবে পরিচিত শরীফগঞ্জ, বুধবারীবাজার, বাদেপাশা, ভাদেশ্বর ও বাঘার লোকজনের মধ্যে বিরাজ করছে বন্যাতঙ্ক। হাকালুকি হাওরে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় হাওর এলাকায় অবস্থিত কালীকৃষ্ণপুর, রাংজিওল, পানিয়াগা, নুরজাহানপুরসহ কয়েকটি গ্রামের লোকজন রয়েছেন মহা দুশ্চিন্তায়।

কোম্পানীগঞ্জ (সিলেট) : হু হু করে বাড়ছে পানি। বিভিন্ন গ্রামীণ সড়ক ডুবে যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে অনেক জায়গায়। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে খোলা হয়েছে আশ্রয়কেন্দ্র। বানভাসী মানুষরা বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে উঠতে শুরু করেছেন।

উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের বেশিরভাগ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। প্রস্তুত রয়েছে ৩৫টি আশ্রয়কেন্দ্র। ধলাই নদের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং সাদাপাথর পর্যটনকেন্দ্র পানিতে নিমজ্জিত হওয়ায় বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পর্যটনকেন্দ্রটি বন্ধ ঘোষণা করেছে প্রশাসন।

শেয়ার করুন
এই ধরনের আরও খবর...
themesba-lates1749691102