May 20, 2024, 7:06 pm
ব্রেকিং নিউজ

মেয়েকে প্রতিষ্ঠিত করতে ১৬ বছর ধরে ঝিয়ের কাজ করছেন তিনি

রিপোর্টারের নাম:
  • আপডেট টাইম Sunday, May 12, 2024
  • 31 দেখা হয়েছে

বরগুনা  প্রতিনিধি:
মেয়েকে মানুষ করতে দিনের বেলায় ঝিয়ের কাজ আর রাতে পৌরসভার রাস্তা ঝাড়ু দিয়েই হার না মানা জীবন যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন বরগুনার রুনু বেগম। ছোট মেয়ে মিমকে নিয়ে স্বপ্ন দেখছেন তিনি।

১৬ বছর আগে দুই মেয়েসহ স্ত্রী রুনু বেগমকে ছেড়ে চলে যান স্বামী নান্টু। এরপর থেকেই জীবন যুদ্ধে নামতে হয়েছে তাকে। বড় মেয়ে ফাতিমাকে পড়াশোনা করাতে না পেরে বিয়ে দিয়েছেন অনেক আগেই।

বরগুনা পৌরসভার ৫নং ওয়ার্ডের জিলা স্কুল সংলগ্ন আমতলারপাড় নামক এলাকার সড়কের পাশে সরকারি জমিতে টিনের তৈরি একটি জরাজীর্ণ ঘরে থাকেন রুনু বেগম। বড় মেয়ের বিয়ে হওয়ায় ছোট মেয়েকে নিয়ে ওই ঘরে থাকেন তিনি। দুই মেয়ের বয়স যখন ৫ ও ২ বছর তখন রানু বেগমকে ডিভোর্স দিয়ে স্বামী নান্টু অন্যত্র চলে যান।

তবে মায়ের স্বার্থহীন ভালোবাসায় বাবা ছেড়ে গেলেও দুই মেয়েকে ছাড়তে পারেননি মা রুনু বেগম। খেয়ে না খেয়ে বড় করেছেন মেয়েদের। তার নিজের চেষ্টায় জেলার মধ্যে ভালো স্কুল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ছোট মেয়ে মিম গত বছর এসএসসি পাশ করেছে।

বর্তমানে মিমকে ভর্তি করেছেন বরগুনা সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগে। রুনু এখন স্বপ্ন দেখছেন মেয়ে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে এবং একদিন মায়ের পাশে দাঁড়াবে। এমন স্বপ্ন পূরণ করতেই রুনু পৌরসভার ঝাড়ু দেওয়ার কাজের পাশাপাশি কাজ করেন বিভিন্ন মানুষের বাসাবাড়িতে।

রুনু বেগমের দীর্ঘ ১৬ বছরের জীবন সংগ্রামের খোঁজ জানতে সরেজমিন তার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, জরাজীর্ণ টিনের ঘরের মধ্যে সামনের একাংশে একটি চুলায় নিজেদের জন্য খাবার রান্না করছেন রুনু। বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মাছ মাংস কেনার সামর্থ্য হয় না তার। যতটুকু সামর্থ্যে কুলোয় তা দিয়ে শাকসবজি ডাল আলুভর্তায় চলে মা মেয়ে দুজনের তিন বেলার খাবার। ঘরের মধ্যে জায়গা সংকটে যে টেবিলে খাবার খেতে হয় সে টেবিলেই লেখাপড়া করতে হয় তার মেয়ে মিমকে। এছাড়া রাত হলে ঘরের একটি মাত্র খাটে ঘুমিয়ে পড়েন মা ও মেয়ে।

মেয়েকে প্রতিষ্ঠিত করতে রুনু বেগমের জীবন যুদ্ধের বিষয়ে প্রতিবেশী ফরিদা বেগম বলেন, আল্লাহ ওরে অনেক ধৈর্য দিছে। মাইয়াডারে মানুষ করার লাইগা মানষের বাসায় কাজ করে রাইতে রাস্তা ঝাড়ু দেয়। এর আগে সরকারি গোডাউনের চাউল ঝাড়ু দিয়ে আইনা রাইনধা খাইতো। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে রাস্তায় ইট ভাঙার কাজও করে। এত কিছু কইরাও ও মাইয়াডারে পড়ালেখা করায়।

রোজী নামের আরেক প্রতিবেশী বলেন, আমি ছোটবেলা থেকেই দেখি রুনু বেগম তার মেয়ের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে কাজ করছেন মানুষের বাসায়। তবে বর্তমান সময়ে এ চেষ্টায় মেয়েকে নিয়ে রুনুর যে স্বপ্ন তা শেষপর্যন্ত পূরণ করতে পারবেন কিনা তা বলা যায় না।

বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে মায়ের চেষ্টায় লেখাপড়া করতে পেরে রুনু বেগমের মেয়ে মিম যুগান্তরকে বলেন, আমার যখন ২ বছর বয়স তখনই নাকি আমার বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। আমি বাবা নামের কাউকে চিনি না। আমার মা মানুষের বাসায় বাসায় কাজসহ পৌরসভায় রাস্তা ঝাড়ু দেওয়ার কাজ করে আমাকে বড় করেছেন, পড়ালেখার খরচ চালাচ্ছেন। বর্তমানে আমি একাদশ শ্রেণিতে পড়ি। লেখাপড়া শেষ করে মায়ের পাশে দাঁড়াতে চাই আমি।

মেয়েকে নিয়ে জীবন সংগ্রামের বিষয়ে রুনু বেগম বলেন, আমার স্বামী চলে যাওয়ার পরে মেয়েদের নিয়ে আমি অনেক কষ্ট করেছি। এক মেয়েকে বিয়ে দিলেও তিন বেলা ঠিকমতো না খেয়ে টাকা বাঁচিয়ে ছোট মেয়েকে পড়াশোনা করাচ্ছি। এখন কলেজের খরচ জোগাতে হিমশিম খেতে হয় আমাকে। মানুষের বাসায় এবং রাস্তা ঝাড়ু দিয়ে মাসে ৬ থেকে ৭ হাজার টাকায় সংসারের খরচ চালিয়ে অনেক সময় মেয়ের প্রাইভেট পাড়ানোর টাকা হাতে থাকে না। কলেজে আসা যাওয়ার খরচ তো দিতেই পারি না। অনেক কষ্ট করেই মেয়েরও লেখাপড়া করতে হচ্ছে। তারপরেও খেয়ে না খেয়ে মেয়েকে প্রতিষ্ঠিত করতে লেখাপড়া চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি।

বরগুনা সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. শামীম মিঞা বলেন, আমরা বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যম ও আমাদের নিজেদের খোঁজে বিভিন্ন অসহায় মানুষদের সন্ধান পেয়ে থাকি। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে বরগুনায় ৮ শতাধিক মানুষকে ঘর দেওয়া হয়েছে। রুনু বেগমের বিষয়টি জেনেছি তার যদি কোথাও নিজের কোনো জমি না থাকে তাহলে আমরা সুযোগ পেলে তাকে একটি ঘরের ব্যবস্থা করে দেব। এছাড়া রুনুর মেয়ের পড়াশোনা করতে বিভিন্ন উপকরণসহ যে কোনো সহযোগিতার প্রয়োজন হলে আমরা উপজেলা প্রশাসন থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব তাকে সহযোগিতা করতে। এর বাহিরে সরকারের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ বিষয়ক প্রকল্পের মাধ্যমে তাদের স্বাবলম্বী করতে সহযোগিতা করা হবে।

শেয়ার করুন
এই ধরনের আরও খবর...
themesba-lates1749691102