May 20, 2024, 7:05 pm
ব্রেকিং নিউজ

ওয়াশিংটন ডিসিতে ব্যতিক্রমধর্মী পুস্তক-আলোচনা

রিপোর্টারের নাম:
  • আপডেট টাইম Sunday, May 5, 2024
  • 38 দেখা হয়েছে

লাবলু আনসার, যুক্তরাষ্ট্র
ওয়াশিংটন ডিসির উপকণ্ঠ, মেরিল্যান্ড রাজ্যের নর্থ পটোম্যাক শহরের স্টোনমিল এলিমেন্টারি স্কুলে ২৮ এপ্রিল দুটি ব্যতিক্রধর্মী বইয়ের পরিচিতি অনুষ্ঠানে একটি অসামান্য আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আয়োজক ছিল স্থানীয় ঢাকা ইউনিভার্সিটি এলামনাই ফোরাম ইনকর্পোরেটেড, সংক্ষেপে ডুয়াফি নামের একটি সংগঠন। অসামান্য ছিল এই কারণে যে দুই ঘণ্টাধিক এই অনুষ্ঠানে প্রায় একশত দর্শক-শ্রোতা সত্যিকার অর্থেই পিনপতন স্তব্ধতায় এক বসাতেই সম্পূর্ণ আলোচনা উপভোগ করেন। অনুষ্ঠানের আয়োজন, সময়ানুবর্তীতা, পরিচালনা, পরিবেশ, আলোচকদের বিষয় ও সময়জ্ঞান, এবং রুচিসম্মত ও সংস্কৃতিমনা দর্শকের এমন সমন্বয় আমেরিকায় তো নয়ই, খোদ বাংলাদেশেও কেউ উপভোগ করেননি বলে বিদগ্ধজনেরা মন্তব্য করেছেন।

এই কারণে মূল আয়োজক, ডুয়াফির সভাপতি ডঃ কাইউম খান এবং সহসভাপতি ডঃ ইশরাত সুলতানা মিতার নাম প্রথমেই উলে­খ করা গুরুত্বপূর্ণ। এই দুজন তাদের তিন সহকর্মী এবং আরো প্রায় দশজন সদস্যের সহযোগিতার যে দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন, তা যে কোনো সংগঠক বা অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য শিক্ষণীয় হয়ে থাকবে। পুরো অনুষ্ঠানের ভিডিওধারণ করেছেন ডঃ আরিফুর রহমান এবং ফটোগ্রাফির দায়িত্ব পালন করেছেন এন্থনি পিউস গোমেস, সুবীর কাস্মীর পেরেরা ও আফ্রিন ফ্যান্সি। পনেরোজনের এই দলের কে যে সভাপতি আর কে যে সাধারণ কর্মী, তা তাদের পোষাক, আচরণ বা অভিব্যক্তি দেখে বোঝার কোনোই উপায় ছিল না। অনুষ্ঠান শুরুর আগে ও পরে চা ও মুখরোচক স্ন্যাক্স’র ব্যবস্থা থাকায় শ্রোতারা লেখক ও আলোচকদের সাথে মতবিনিময় করার সুযোগ পান।
লেখক ও বিজ্ঞানী ডঃ আশরাফ আহমেদের এ বছরে প্রকাশিত যে বই দুটো নিয়ে আলোচনা হয় তার নাম ‘বাংলা সাহিত্যের প্রথম কল্পবিজ্ঞান লেখক বেগম রোকেয়া’ এবং ‘রোমান সাম্রাজ্যের বর্তমান ও অতীত’। ১৭৬ পৃষ্ঠার দুটি বইই প্রকাশ করেছে ঢাকার আগামী প্রকাশনী।
স্বাগত বক্তব্যে ডুয়াফির সভাপতি ড. কাইউম খান উল্লেখ করেন যে, লেখক ডঃ আশরাফ আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ রসায়ন বিভাগের শিক্ষক হলেও একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীব বিজ্ঞান বিভাগের প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। লেখক এ পর্যন্ত ১৫টি বাংলা বই প্রকাশ করেছেন। এরপর সঞ্চালক ড. ইশরাত সুলতানা মিতা লেখকের স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌসকে মঞ্চে আহবান করেন। তিনি ‘লেখকের বউ এবং লেখকের বই পরস্পরের সতীন’ মন্তব্য করে স্বামীর হাতে মাইক্রোফোনটি তুলে দেয়ার সময় শ্রোতৃমন্ডলে হাসির হুল্লোড় বয়ে যায়।

সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে লেখক বলেন, শিশুকালে ঘুড়ি ওড়ানোর জন্য কুড়িয়ে আনা নানান ধরণের সূতা একসাথে রেখে দিতাম। পরে অনেক সময় লাগিয়ে দলা পাকানো সূতা থেকে একটা একটা করে ব্যবহারযোগ্য সূতা আলাদা করতাম। সেই অভ্যাসটি আমার এখনো রয়ে গেছে। সাপ্তাহিক আড্ডা ও দাওয়াতে আপনারা অনেক কিছু নিয়েই আলোচনা করেন, কথা বলেন, যার অধিকাংশই অনেক কথার ভিড়ে হারিয়ে যায়। দলা পাকানো সূতার প্যাঁচ খোলার মতোই আপনাদের কথা, আপনাদের চিন্তা ও মনোভাবটি আমি অনেক কথার ভিড় থেকে তুলে আনি, লিখে প্রকাশ করি। কাজেই লেখার মাঝে আমার কৃতিত্ব কিছু নেই, সব কৃতিত্ব আপনাদের, আমি আপনাদের কথাই লিখি। কিন্তু আজকের আলোচনার দুটি বইতে আপনাদের কথা সরাসরি না থাকলেও একই সমাজের সভ্য হিসাবে আপনাদেরও অবদান রয়েছে।

রোমান সাম্রাজ্য এবং বেগম রোকেয়া বই দুটোর যথাক্রমে মোড়ক উন্মোচন করেন বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান ড. ফখরুদ্দিন আহমেদ এবং সাংবাদিক রোকেয়া হায়দার। বইটির শিরোনামের সাথে একজন মহীয়সী নারীর নাম ও নিজের নামের অভিন্নতার জন্য এই বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করতে পারায় রোকেয়া হায়দার উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সুলতানার স্বপ্ন গল্পের মাধ্যমে বেগম রোকেয়াকে আমরা একজন নারীবাদী লেখক হিসাবেই জানতাম। কিন্তু বিজ্ঞানী আশরাফ আহমেদ শতবর্ষ পরে তার নিবিঢ় গবেষণা থেকে রোকেয়ার বিজ্ঞানচেতনাকে উন্মোচন করেছেন।
এরপর বইদুটো নিয়ে পর্যায়ক্রমে নিবিড় আলোচনা করেন ডঃ ফখরুদ্দিন আহমেদ, স্থাপতিক ইতিহাসবিদ অধ্যাপক আদনান মোর্শেদ, সাহিত্য সমালোচক আহমাদ মাযহার, কল্পবিজ্ঞান লেখক মোস্তাফা তানিম, স্থপতি আনোয়ার ইকবাল, এবং অধ্যাপক আমিনুর রহমান।

‘রোমান সাম্রাজ্যের বর্তমান ও অতীত’ বইয়ের আলোচনায় সাবেক কেয়ারটেকার সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দিন আহমেদ বলেন যে, স্ত্রীসহ অনেকবার ইতালি ভ্রমণ করেছেন বলে ঔৎসুক্যের সাথে তিনি বইটি পড়েছেন। বইটিতে ভ্রমণের পাশাপাশি রয়েছে রোমান সাম্রাজ্যের ইতিহাস, স্থাপত্য, শিল্পকলা, ইত্যাদি বিষয়ে বিষদ বর্ণনা। এছাড়া ইতালিতে প্রবাসী বাঙালিদের জীবনধারার ওপরও আলোকপাত করা হয়েছে। লেখকের অনুসন্ধিৎসুতা, নিগুঢ় পর্যবেক্ষণ এবং ঘটনা অনুধাবন ক্ষমতার প্রশংসা করে দুই সহস্রাধিক বছর আগে জুলিয়াস সিজারের হত্যার সাথে বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যার সুন্দরভাবে তুলনা করেছেন বলে মন্তব্য করেন। ঐতিহাসিক সময়ে লেখক নিজেকে উপস্থিত করে ইতিহাস বর্ণনা করার কৌশলটি তার ভালো লেগেছে বলে মন্তব্য করেন। বিশেষ বিশেষ উদাহরণ তুলে ধরে অনেক ক্ষেত্রেই লেখক ঐতিহাসিক ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন নিজেকে সেখানে উপস্থিত করে, যা তার খুব ভালো লেগেছে।

বইতে লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চির অসংখ্য তথ্য সংযুক্তিকে বিশেষভাবে উল্লেখ করে ড. ফখরুদ্দিন বলেন, বইটি খুব বড় না হলেও এর ভেতরে অনেক তথ্য, তত্ত্ব ও উপাত্ত লুকিয়ে আছে, যা আগে তার জানা ছিল না। নিজে একজন অর্থনীতিবিদ হওয়ায় ভ্রমণকালে আনুষঙ্গিক খরচের উল্লেখ থাকায় বইটি সুদূর ভবিষ্যতে অর্থনীতির গবেষকের প্রয়োজনে আসলেও আসতে পারে। তবে স্থাপত্য ও চিত্রশিল্পে আগ্রহীদের কাছে বইটি ততো আকর্ষণীয় নাও হতে পারে। কিন্তু ভ্রমণবিলাসী এবং সাধারণ পাঠক, উভয়েই বইটি বারবার পড়বেন বলে তিনি মনে করেন।

স্থাপতিক ইতিহাসবিদ ও ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটির আর্কিটেক্চার এ্যান্ড প্ল্যানিং এর অধ্যাপক এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইঙ্কক্লুসিভ আর্কিটেকচার এ্যান্ড আরবানিজমের পরিচালক ড. আদনান মোর্শেদ বলেন, বিগত দুইশত বছর ধরে রোমান সাম্রাজ্য ও ইতিহাসের ওপর অসংখ্য বই লেখা হয়েছে। তাই শিরোনাম ‘রোমান সাম্রাজ্যের বর্তমান ও অতীত’ দেখে বইটিতে নতুন কিছু থাকবে না মনে করে কিছুটা হতাশ হয়েছিলেন। কিন্তু দুই তিনদিন ধরে বইটি পড়তে গিয়ে দেখতে পেলেন আমরা সচরাচর ভ্রমণকে বিনোদন হিসাবে দেখে থাকলেও লেখক আশরাফ আহমেদ ভ্রমণকে একান্ত নিজস্ব অবলোকনের সাথে জ্ঞানচর্চা ও ইতিহাস সচেতনতার একটি সার্বিক সম্মিলন ঘটিয়েছেন। শুধু তাই নয়, বইটিতে অনেক ঐতিহাসিক চরিত্রকে বর্তমানে নিয়ে আসাকে তিনি ‘নভেল’ বা ‘অভিনব’ বলে ব্যক্ত করেন, যা তার সবচেয়ে ভালো লেগেছে।
অধ্যাপক আদনান বলেন, লেখক রোম, নেপলস, ফ্লোরেন্স, ভেনিস, যেখানেই গেছেন সেখানকার একটি সংবেদনশীল ইতিহাস বর্ণনা করেছেন। রোমে তার সাথে দেখা হলো একুশশত বছর আগের জুলিয়াস সিজারের সাথে। সিজারের হত্যাকে তিনি একটি লেন্স হিসাবে ব্যবহার করেছেন বঙ্গবন্ধুর হত্যাকে দেখার জন্য। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর হত্যার সাথে জড়িত খন্দকার মুশতাককে তিনি দেখিয়েছেন ৪৫ খৃষ্টপূর্বাব্দে জুলিয়াস সিজারের হত্যাকারী ব্রুটাস হিসাবে। আবার পিসা শহরে তার সাথে দেখা হলো গ্যালেলিওর সাথে যিনি তার নতুন বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারার কারণে নিগৃহীত হয়েছিলেন, বর্তমান সময়েও গতানুগতিকতার বাইরে কোনো কথা বললে আমাদের বিড়ম্বনার শিকার হওয়ার মতো। এভাবে একেকটি ঐতিহাসিক চরিত্রকে বর্তমানে নিয়ে আসাকে আশরাফ আহমেদের বইটিকে তিনি নোভেল বা অভিনব বলে মনে করেন। শুধু ভ্রমণ নয়, তিনি ইতালিয় এবং সেখানে বাস করা বাঙালিদের চরিত্রও পর্যবেক্ষণ করে তা তুলে ধরেছেন। পুরো বইটি পড়লে বোঝা যায় যে শুধুমাত্র একজন ভ্রমণকারীই নন, তিনি অত্যন্ত সংবেদনশীল তীক্ষ্ণ ও নিবিঢ় একজন পর্যবেক্ষকও বটে। অবসর জীবনেও জ্ঞানচর্চায় নিয়োজিত থাকায় আশরাফ আহমেদকে তিনি একজন ‘আদর্শ অবসরপ্রাপ্ত’ ব্যক্তি বলে মনে করেন। বইটির পরবর্তী সংস্করণে কয়েকটি সঠিক ঐতিহাসিক তারিখ ব্যবহার করতে তিনি লেখককে পরামর্শ দেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষক ও ভার্জিনিয়ার জর্জ ম্যাসন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক, কবি ও সাহিত্যিক ড. আমিনুর রহমান কয়েকটি স্লাইডের মাধ্যমে ভ্রমণসাহিত্যের কাঠামোর আলোকে আশরাফ আহমেদের ‘রোমান সাম্রাজ্যের বর্তমান ও অতীত’ বইটির সমালোচনা করেন। একটি স্লাইডে চারটি ধাপে তিনি ভ্রমণসাহিত্য’র ব্যবচ্ছেদ করেন। ভ্রমণ শুরু হয় পরিকল্পনা ও মানসপটে স্থান বা দেশটি সম্পর্কে কল্পনা করে। পূর্বধারণাকে প্রমাণ অথবা অপ্রমাণ করাই হচ্ছে ভ্রমণ সাহিত্যের মূল বিষয়। এরপর ভ্রমণকালে কল্পনার সাথে বাস্তবকে মিলিয়ে দেখে। এরপর ভ্রমণটির মূল্যায়ন করে, এবং সর্বশেষে (আহরিত অভিজ্ঞতা থেকে একটি সার্বিক মন্তব্য করার জন্য এক ধরণের) কর্তৃত্ব বা অধিকার অর্জন করে। আশরাফ আহমেদ তার ভ্রমণকাহিনিতে এর সবগুলোই করেছেন।

ড. আমিনুর বলেন, ‘পরিপ্রেক্ষিত জানা না থাকলে সাহিত্য ও রূপকথার পার্থক্য বোঝা যায় না’। ‘ভ্রমণকারী যেখানে যান বা দেখেন, সেখানকার ইতিহাসের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন যেন তিনিও সেই ইতিহাসের একটি অংশ। এই ব্যাপারটি যদি তিনি ভাবতে পারেন বা পাঠককে ভাবাতে পারেন তখনই একটা লেখা স্বার্থক হয়। ভ্রমণে গিয়ে আশরাফ আহমেদ রোমান সাম্রাজ্যের যে যে নিদর্শন, শহর, মন্দির এবং সেখানকার বাঙালিদের যা যা দেখেছেন তা অকপটে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন, মনে হয় যেন আমিও তার সাথে ভ্রমণ করছি’।

মাইকেলঞ্জেলোর আঁকা ছবিগুলো সম্পর্কে আশরাফ আহমেদের বিবেচনা তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে বলে মন্তব্য করেন। একইভাবে ‘তিনি যে যে স্থাপনা ও ভাষ্কর্য দেখেছেন সেসবের ব্যাখ্যা পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন’। ‘ক্রিয়েশন অফ এডাম’ ছবিটি যে মানুষের মস্তিষ্কপ্রসূত কল্পনা, তা আগে জানা থাকলেও বিষয়টি বইটিতে গভীরভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। পাঠকের মনে চিন্তা সৃষ্টিকারী শুধুমাত্র এই একটি কারণেই বইটি সার্থক বলে ড. আমিনুর রহমান মনে করেন। মাইকেলেঞ্জেলো সৃষ্ট ‘পৃথিবীর সবচেয়ে নিখুত ভাষ্কর্য’ ডেভিড মূর্তি নিয়ে বইটিতে আশরাফ আহমেদ গভীরতর পর্যালোচনা করেছেন বলে মন্তব্য করেন। ড. আমিনুর বলেন, ‘মানুষের সৃষ্টিশীলতা কোন নিখুঁত পর্যায়ে গেলে মানুষ সমস্ত সৃষ্টিকে, সৌন্দর্যকে একটা স্থাপনার মধ্যে উপস্থাপন করতে পারেন, মাইকেলেঞ্জেলো তার প্রমাণ। আশরাফ আহমেদের বই পড়ে আমি নতুন করে মাইকেলেঞ্জেলোর প্রেমে পড়েছি’। তীর্যক মন্তব্যের মাধ্যমে বইটির কয়েকটি ত্রুটি তুলে ধরলেও উদাহরণসহ সেগুলোর ইতিবাচক ব্যাখ্যা দিতেও ভোলেননি। এগুলো হচ্ছে প্রচ্ছদে বইয়ের নামের আগে লেখকের নাম এবং ভ্রমণসাহিত্যে ট্যাক্সিভাড়া ও খাবারের বিল, ইত্যাদির প্রয়োজনীয়তা বা অপ্রয়োজনীয়তা।

বাংলা সাহিত্যের প্রথম কল্পবিজ্ঞান লেখক বেগম রোকেয়া : কুড়িটি কল্পবিজ্ঞান পুস্তকের জনপ্রিয় লেখক ও সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার মোস্তাফা তানিম বলেন, আশরাফ আহেমেদের প্রকাশিত সব বইই আমি পড়েছি, কিন্তু ‘বাংলা সাহিত্যের প্রথম কল্পবিজ্ঞান লেখক বেগম রোকেয়া’ বইটি অনন্য। কারণ হচ্ছে এতে লেখক বেগম রোকেয়াকে সম্পূর্ণ নতুনরূপে আমাদের কাছে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। রোকেয়ার বিজ্ঞানমনষ্কতা ও বিজ্ঞান সচেতনতার তথ্যগুলি শতবর্ষ পরে হলেও বাঙালি সমাজের সামনে তুলে আনার জন্যে লেখক আশরাফ আহমেদকে প্রাণঢালা অভিনন্দন জানান। ইঞ্জিনিয়ার মোস্তাফা তানিম বলেন, প্রেক্ষিত জানা না থাকলে কোনো কাজেরই সঠিক মূল্যায়ন করা যায় না। প্রথম অধ্যায়ে ৫৮টি এবং পরবর্তী প্রতিটি অধ্যায়ে অসংখ্য তথ্যসূত্র উল্লেখ করে ধাপে ধাপে তিনি সফলভাবে প্রমাণ করেছেন যে বেগম রোকেয়ার ‘সুলতানার স্বপ্ন’ একটি বিজ্ঞান কল্পকাহিনি। মোস্তফা তানিম বলেন, ১৯৪৬ সালে সর্বপ্রথম কৃত্রিম উপায়ে বৃষ্টিপাত ঘটানোর তথ্য উল্লেখ করে আশরাফ আহমেদ বলছেন, এর চেয়ে চল্লিশ বছর আগে ‘সলতানার স্বপ্ন’তে বেগম রোকেয়ার কৃত্রিম উপায়ে আকাশের মেঘ থেকে বৃষ্টির পানি নামানোর কল্পনাটি ছিল তখনকার বৈজ্ঞানিক জ্ঞান থেকে অনেক প্রাগ্রসর। বিজ্ঞানের এই প্রাগ্রসরতা মানুষ ও সমাজের কল্যাণে ও বিনোদনে যদি গল্পে সম্পৃক্ত করা যায়, তবে তা হয় একটি বিজ্ঞান কল্পকাহিনি। সেই বিবেচনায় ‘সুলতানার স্বপ্ন’ নিশ্চিতভাবে একটি বিজ্ঞান কল্পকাহিনি। গল্পটি যে বাংলা সাহিত্যের প্রথম এবং বিশ্বসাহিত্যে অন্যতম তা প্রমাণ করার জন্য আশরাফ আহমেদ আরো কয়েকটি অধ্যায় যুক্ত করেছেন। তিনি বলেন, পরিশিষ্টে জুড়ে দেয়া জগদানন্দ রায়ের ‘শুক্রভ্রমণ’ এবং জগদীশ চন্দ্র বসুর ‘পলাতক তুফান’ পাঠকরা প্রথমেই পড়ে নিলে, আশরাফ আহমেদের বিশ্লেষণে কেন সেগুলো বিজ্ঞান কল্পকাহিনি নয় তা বুঝতে সুবিধা হবে।

নন্দিত স্থপতি, কবি ও লেখক আনোয়ার ইকবাল কচি উচ্ছ্বাসের সাথে বলেন, বেগম রোকেয়ার সাথে আশরাফ আহমেদ নতুন করে নয়, প্রথমবারের মতো পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন, আমার চোখ খুলে দিয়েছেন। সুলতানার স্বপ্ন’তে নারী বিজ্ঞানীরা উড়োজাহাজ নির্মাণ, এবং গৃহস্থালী কাজে বিদ্যুৎ ও সূর্যালোকের ব্যবহার করেছিলেন, আশরাফ আহমেদ সেসবের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ করেছেন। সূর্যের আলোকে নল দিয়ে ঘরের ভেতরে নিয়ে আসার যে কল্পনা রোকেয়া করেছিলেন, তা মাত্র দশ বছর আগে ‘সোলার টিউব’ এর বাস্তব ব্যবহারের মাধ্যমে আমেরিকার স্থপতিদের মাঝে খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। নতুন এই তথ্যটি বইয়ের পরবর্তী সংস্করণে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য তিনি লেখক আশরাফ আহমেদকে পরামর্শ দেন। এই থেকে এবং তেমন আরো অনেক উল্লেখ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাবঞ্চিত বেগম রোকেয়ার প্রাগ্রসর বৈজ্ঞানিক চিন্তার ক্ষমতার কথা ভাবলে আশ্চর্য হতে হয়। তিনি বলেন, বইয়ের পেছনে দেয়া গ্রন্থসূত্রের সংখ্যা দেখে ঘাবড়ে যাওয়ার অবস্থা হয়। বইটি লিখতে গিয়ে আশরাফ আহমেদ যে তার বৈজ্ঞানিক গবেষণার মতোই গুরুত্বের সাথে রোকেয়ার ওপর গবেষণাটি করেছেন। এই আলোচনা অনুষ্ঠানে তাকে বলার সুযোগ পাওয়ায় তিনি নিজেকে ধন্য মনে করছেন।

প্রাবন্ধিক ও সাহিত্য সমালোচক আহমাদ মাযহার বলেন, একই ব্যক্তির মধ্যে বিজ্ঞান ও সাহিত্যে একই পরিমাণে উৎসাহ সচরাচর পাওয়া যায় না, যা আশরাফ আহমেদের মাঝে আছে। বিজ্ঞান চর্চার মাধ্যমে তিনি যে অনুসন্ধিৎসু মনের অধিকারী হয়েছেন এর সাথে তার সাহিত্যিক রসবোধ যুক্ত করে তিনি যা বলতে পারবেন, তা একজন বিজ্ঞানী বা একজন সাহিত্যিক বলতে পারবেন না। তাই এই ধরনের বই লেখা তাঁর কাছে সময়ের একটি দাবি ছিল তিনি তা পূরণ করেছেন এই ‘বাংলা সাহিত্যের প্রথম বিজ্ঞান কল্পকাহিনি লেখক বেগম রোকেয়া’ বইটি রচনা করে।
আহমাদ মাযহার বলেন, রোকেয়ার ওপর যে কাজটি তিনি করেছেন তা বাংলা সাহিত্যে একটি অবদানধর্মী। রোকেয়াকে আমরা একজন নারীবাদী লেখক, নারী জাগরণের অগ্রদূত, ও সমাজ সংস্কারক হিসাবে জানি। কিন্তু তার উৎকৃষ্ট সাহিত্য প্রতিভার প্রকৃত মূল্যায়ন এখনও করা হয় নাই। এই পরিপ্রেক্ষিতে রোকেয়ার মধ্যে যে প্রবল বিজ্ঞান সচেতনতা ছিল তাও একশত বছর ধরে কোনো পাঠকের দৃষ্টিতে ধরা পড়ে নাই। তা আশরাফ আহমেদের চোখে পড়েছে। এটি অত্যন্ত মৌলিক একটি কাজ এবং বাংলা সাহিত্যে রোকেয়া চর্চায় পান্ডিত্যপূর্ণ যতো লেখা হয়েছে তার সাথে সংযুক্ত করা সমিচীন বলে মনে হয়। রোকেয়া যে একজন কল্পবিজ্ঞান লেখক তা ভাবতে গেলে যে মুক্তমনের প্রয়োজন তা আমাদের নাই। এই পরিপ্রেক্ষিতে আশরাফ আহমেদ প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য এই জন্য যে তিনি অনুশীলনের মধ্য দিয়ে তাঁর অতৃপ্তিকে অতিক্রম করতে প্রতিনিয়ত চেষ্টা করছেন।

আহমাদ মাযহার বলেন, একইভাবে তার বার্ধক্য জীবনের অনুভব আলোকে লেখা ‘রোমান সাম্রাজ্যের বর্তমান ও অতীত’ একটি নিছক ভ্রমণকাহিনির পরিবর্তে বিশেষত্ব নিয়ে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। তিনি একটি সার্থক ভ্রমণ সাহিত্যের অত্যাবশ্যকীয় উপকরণ নিয়েও আলোচনা করেন। এই প্রসঙ্গে মাযহার বলেন, ‘ভ্রমণসাহিত্যে থাকতে হবে ভ্রমণের বিস্তারিত বর্ণনা, ভ্রমণকারীর ব্যক্তিগত পরিপ্রেক্ষিত, অভিজ্ঞতা ও তার প্রতিভাস, স্থানীয় সামগ্রিক সাংস্কৃতিক পরিচয়; থাকতে হবে ঐতিহ্য ও রীতির জীবন-যাপনের ধরনের পরিচয়, ভ্রমণকারীর অভিযাত্রী মানসিকতার চিহ্ন। ভ্রমণসাহিত্যে প্রতারণা করলে চলবে না, এবং সর্বোপরি থাকতে হবে লেখকের নিজস্ব আবেগ ও অনুভূতির প্রকাশের সবই এই বইয়ে আছে।
আলোচনা পর্ব শেষে নন্দিত শিল্পী অদিতি সাদিয়া রহমান এবং ডরোথি বোসের ছোটো একটি কবিতা-গানের আয়োজন অনুষ্ঠানটিকে শৈল্পিক ব্যঞ্জনায় মূর্ত করে তোলে। ডুয়াফির সম্পাদক ইরাজ তালুকদারের ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মাঝ দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।

শেয়ার করুন
এই ধরনের আরও খবর...
themesba-lates1749691102