February 22, 2024, 6:59 am
ব্রেকিং নিউজ

ছোট ভুমিকম্পের ফলে বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে বড় বিপর্যয়ের ঝুঁকিতে

রিপোর্টারের নাম:
  • আপডেট টাইম Sunday, December 3, 2023
  • 79 দেখা হয়েছে

 

হায়দার আলী, স্টাফ রিপোর্টার, চট্টগ্রাম

ছোট ছোট ভুমিকম্পের ফলে বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে বড় বিপর্যয়ের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। এ তালিকায় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম। গত কয়েক বছরের পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার ভিত্তিতে এ তথ্য বিশেষজ্ঞরা তুলে ধরেছেন।

গতকাল শনিবার সকাল ৯ টা ৩৫ মিনিটে ৩৩ সেকেন্ডের স্থায়ী ভুমিকম্পটি চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় অনুভূত হয়। এতে কোনো হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও আতঙ্কিত হয়ে তারাহুরা করে বের হতে গিয়ে বিভিন্ন স্থানে শতাধিক লোকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
ইউরোপীয়ান মেডিটেরিয়ান সিসমোলজিক্যাল সেন্টার (ইএমজিএস) ও মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) এর তথ্য মতে “গতকালের ভুমিকম্পটির উৎপত্তি স্থল ছিল কুমিল্লা থেকে ৪৬ কিলোমিটার দক্ষিণ- দক্ষিণ পশ্চিমে ও লক্ষীপুরের রামগঞ্জ থেকে ৮ কিলোমিটার উত্তর পূর্বে। এটি ভূপৃষ্ঠ থেকে ১০ কিলোমিটার গভীরে। এ ভুমিকম্পের মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৮। এ ছাড়াও জার্মান রিসার্চ সেন্টার ফর জিওসায়েন্সেস এর মতে ভুমিকম্পটির মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৮। এ ভুমিকম্পটি চট্টগ্রামসহ ঢাকা, লক্ষীপুর, কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফেনী, সিলেট, টাঙ্গাইল, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, রাজশাহী ও রংপুরে অনুভূত হয়েছে।

এর আগে গত ২ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬ টা ৪৭ মিনিটে ১৭ সেকেন্ড স্থায়ী ঢাকা ভুমিকম্প অনুভুত হয়। এটির উৎপত্তি স্থল ছিল ভারতের মেঘালয় রাজ্যের বেসুবেল পাড়া থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে।
এর আগে গত ১৭ সেপ্টেম্বর ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকা ভুমিকম্পে কেঁপে ওঠে। এর মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৪ দশমিক ২। টাঙ্গাইলে এ ভুমিকম্পের উৎপত্তি স্থল ছিল। এছাড়াও চলতি বছরে ১১ টি হালকা ও মাঝারি ধরনের ভুমিকম্প অনুভুত হয়। এসব ভুমিকম্পে কোনো ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও ভবিষ্যতে বড় ধরনের ভুমিকম্পের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।”
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) এর ইনস্টিটিউট অব আর্থকোয়েক ইঞ্জিনিয়ারিং রিসার্চ সুত্রে জানা যায়, “চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামে ভুমিকম্পের ফল্ট বা চ্যুতি রেখা রয়েছে। এ অঞ্চলে প্রায় ছোট ছোট ভুমিকম্প অনুভূত হচ্ছে। এ-সব ভুমিকম্প বড় ভুমিকম্পের আভাস যা ৭ থেকে ৮ মাত্রার ভূমিকম্পের আশঙ্কা বহন করে। ভুমিকম্পের এ ৩ টি ফল্ট বা চ্যুতিরেখা দেশের বড় ৩ টি শহরের উপর অধিক ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম – কক্সবাজার উপকূল অঞ্চল সীতাকুণ্ড – টেকনাফ ফল্ট বা চ্যুতিরেখায় প্রচুর পরিমাণ স্থিতিস্থাপক শক্তি জমা রয়েছে। যা দেশে ভুমিকম্পের উৎস বলে মনে করা হয়। এছাড়াও শিলং মালভূমির দক্ষিণ পাদদেশের ৩০০ কিলোমিটার পূর্ব পশ্চিম ফল্ট বা চ্যুতিরেখাও রয়েছে।”
চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানসহ বেশকিছু জেলা শহর বা শহরতলিতে নির্বিচারে পাহাড় বা টিলা কেটে কিংবা পুকুর বা দীঘি ভরাটের মাধ্যমে ভবন বা বাড়িঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। তাছাড়াও পুরানো জরাজীর্ণ বাড়িঘর, অপরিকল্পিত ও ত্রুটিপূর্ণ নির্মাণ সামগ্রী দিয়ে ভবন বা বহুতল ভবন নির্মাণও ভুমিকম্পের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলা হচ্ছে। যদি ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড ১৯৯৩ অনুসরণ করে ভবন নির্মাণ খরচ ২-৩ শতাংশ বেশি হলেও ভুমিকম্প প্রতিরোধী নিয়ম মেনে ভবন নির্মাণ করা হলে এ-সব ভবন ভুমিকম্পের ঝুঁকি থেকে রেহাই পাওয়া যেত বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) এর আর্থ অবজারভেটরি বিভাগের সাবেক পরিচালক ভূতত্ত্ববিদ প্রফেসর ডক্টর সৈয়দ হুমায়ূন আখতার গণমাধ্যমে বলেন, “বড় ভুমিকম্প যে কোনো সময় হতে পারে। ফল্ট বা চ্যুতিরেখায় সঞ্চিত শক্তি যে কোনো সময় বের হতে পারে। তিনি আরও বলেন, “পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠ আলাদা আলাদা টেক টনিক প্লেট দিয়ে তৈরি হয়েছে। এ সব প্লেট নিচের নরম পদার্থের ওপর ভাসছে। পুরো পৃথিবীতে এ রকম ৭ টি প্লেট ও অসংখ্য ছোট ছোট সাব-প্লেট রয়েছে। এগুলো যখন নরাচড়া করতে থাকে বা সরে যায় কিংবা একটি অন্যটিকে ধাক্কা দিয়ে থাকে তখন ভূত্বকের মধ্যে ইলাস্টিক এনার্জির শক্তি সঞ্চিত হতে থাকে। যখন সেই সঞ্চিত শক্তি কোনো বিদ্যমান বা নতুন ফাটল দিয়ে বের হয়ে আসে তখন ভূপৃষ্ঠে কম্পন তৈরি হয়ে ভুমিকম্প হয়। এ ছাড়াও ভূত্বকের যে-সব স্থানে একটি প্লেট এসে আরেকটি প্লেটের কাছাকাছি মিশে বা ধাক্কা দিচ্ছে বা ফাটলের তৈরি হয়েছে সেটিকে ফল্ট লাইন বলা হয়।”
জানা যায়, “যদি ৭-৮ মাত্রার ভুমিকম্প হয় তাহলে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের প্রায় দেড় লক্ষাধিক ভবন ধসে পড়তে পারে। আর্থকোয়েক ইঞ্জিনিয়ারিং রিসার্চ সেন্টারের ১০ বছর আগের এক গবেষণার তথ্য জানা যায়, ” চট্টগ্রাম মহানগরীতে ১ লক্ষ ৮৪ হাজার ভবনের মধ্যে ৭৪০ টি স্কুলসহ ১ লক্ষ ৪২ হাজার ভবন ভুমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে।”

ভুমিকম্পের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি বিষয়ক সাম্প্রতিক এক গবেষণা সুত্রে জানা যায়, “চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর পশ্চিম তীর সংলগ্ন বেলে মাটির উপর অধিকাংশ বৃহদাকার স্থাপনা গড়ে উঠেছে। যেখানে চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর ও ইস্টার্ন রিফাইনারিসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে। বড় ভুমিকম্পের সময় সেখানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। কোনো প্রেট্রোলিয়াম কেমিক্যাল স্থাপনায় আগুন লাগলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। চট্টগ্রাম নগরীর মধ্যে বিভিন্ন অপ্রশস্ত সড়কের দুপাশে গড়ে ওঠা অনেক ভবনে অগ্নি দুর্ঘটনা মোকাবিলা করা কঠিন হতে পারে। বড় ভুমিকম্পে বঙ্গোপসাগরের মহী সোপানে ভূমিধসের ঘটনা ঘটতে পারে। এসময় সাগরের তলে ভূমিধসের কারণে সুনামি সৃষ্টি হওয়ার আশংকা রয়েছে।”

রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট) এর উপাচার্য প্রফেসর ডক্টর মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম গণমাধ্যমে বলেন, “আমরা ইতিপূর্বে গবেষণার ভিত্তিতে বাংলাদেশের ৫ টি জায়গা থেকে ভুমিকম্প সৃষ্টি হতে পারে। এর মধ্যে ৩টি বাংলাদেশ – মিয়ানমার সীমান্তে আর ২টির মধ্য একটি বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত এলাকার একেবারে দক্ষিণ পূর্ব দিকে সিলেটের ডার্কি ফল্ট থেকে ভুমিকম্পের উৎপত্তি হতে পারে। আরেকটি ময়মনসিংহ-মধুপুর ফল্ট।”

শেয়ার করুন
এই ধরনের আরও খবর...
themesba-lates1749691102